বাজেটে নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা এলেও এখনো প্রকাশ হয়নি সরকারি প্রজ্ঞাপন বা গেজেট। ফলে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসেনি। তবে বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত রূপ, বাস্তবায়নের ধাপ এবং জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ কতটা গ্রহণ করা হবে—এসব বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। এ কারণেই গেজেট প্রকাশে দেরি হচ্ছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, কমিশনের
সুপারিশ তিন ধাপে কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। সেই পরিকল্পনায়
২০২৬ সালের ১ জুলাই মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, ২০২৭ সালের ১ জুলাই বাকি ৫০ শতাংশ
এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা চালুর প্রস্তাব
ছিল।
তবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নিয়মিত বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টের কারণে অনেক সরকারি কর্মীর বর্তমান মূল বেতন ইতোমধ্যেই প্রস্তাবিত কাঠামোর কাছাকাছি চলে এসেছে। ফলে অর্ধেক হারে নতুন বেতন কার্যকর করলে প্রত্যাশিত সুফল নাও মিলতে পারে। একই সঙ্গে বেতন কাঠামোতে অসামঞ্জস্য তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।
এই বাস্তবতায় দুই ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এর আওতায় চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন মূল বেতন চালু এবং পরবর্তী অর্থবছরে ভাতা কার্যকরের প্রস্তাব ছিল। তবে সাম্প্রতিক আলোচনায় আবারও তিন ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। যেখানে প্রথম ধাপে মূল বেতন এবং পরবর্তী ধাপগুলোতে বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন পে স্কেল নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আপত্তির যে আলোচনা রয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইএমএফ শুধু অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে জানতে চেয়েছে; পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো আপত্তি জানায়নি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে বাজেট ঘাটতি ও রাজস্ব আয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগে জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কমিশনের প্রস্তাবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়।
তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব সক্ষমতা ও বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে কমিশনের সুপারিশে পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মূল বেতন, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে সংশোধনের সম্ভাবনা রয়েছে।
গেজেট প্রকাশের সময় নিয়েও রয়েছে ভিন্ন মত। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন আগস্টেই প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে, আবার কেউ বলছেন প্রক্রিয়া শেষ করতে অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে সরকারের অবস্থান হলো, গেজেট পরে প্রকাশ হলেও নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকেই কার্যকর ধরা হবে। ফলে গেজেট প্রকাশের পর জুলাই থেকে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা বকেয়া হিসেবে পাবেন কর্মীরা।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে আরেকটি বড় বিষয় হলো প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি। সরকারি বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন ও অন্যান্য সুবিধা বর্তমানে ইএফটি এবং আইবাস প্লাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নতুন কাঠামো যুক্ত করতে এসব ব্যবস্থায়ও প্রয়োজন হবে পরিবর্তন।
গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বাড়ছে অপেক্ষা। তাদের দাবি, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় দ্রুত নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা জরুরি।
এখন অপেক্ষা সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের। কমিশনের সুপারিশে কী পরিবর্তন আসছে, কত ধাপে বাস্তবায়ন হবে এবং গেজেট কবে প্রকাশ হবে—এসব বিষয় পরিষ্কার হলেই শেষ হবে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা।
মন্তব্য করুন