আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগে সিদ্ধান্তহীনতা থাকায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের অবকাঠামোগত সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ। সময়মতো নতুন সক্ষমতা যুক্ত করা না গেলে আগামী দশকে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ব্যান্ডউইথ ঘাটতির কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
সোমবার ঢাকার অদূরে একটি রিসোর্টে টেলিকম ও টেকনোলজি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব কথা বলা হয়।
কর্মশালায় জানানো হয়, গত এক দশকে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বেড়েছে নজিরবিহীন হারে। ২০১৩ সালে যেখানে ব্যবহার ছিল মাত্র ৫০ জিবিপিএস, ২০১৮ সালে তা বেড়ে ০ দশমিক ৭৬ টেরাবিট, ২০২০ সালে ১ দশমিক ৭৮ টেরাবিট, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ২ টেরাবিট, ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৮৬ টেরাবিট এবং ২০২৬ সালে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১৩ বছরে ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ২৬০ গুণ।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা ১৯ দশমিক ১ টেরাবিট, ২০২৮ সালে প্রায় ২৭ টেরাবিট, ২০৩০ সালে ৫৪ টেরাবিট, ২০৩৫ সালে ৩০৫ টেরাবিট এবং ২০৩৬ সালে ৪৩২ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড সেবা, ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট ও শিল্প খাতে ডিজিটালাইজেশনের কারণে এ চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
দুটি ক্যাবলের ওপর নির্ভরতা
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগের প্রধান ভরসা বর্তমানে সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫—এই দুটি সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল। এগুলোর সক্ষমতা যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ ও ২ দশমিক ৫ টেরাবিট। বাকি ব্যান্ডউইথ ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল (আইটিসি) দিয়ে আমদানি করা হয়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মাত্র দুটি সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর নির্ভরতা দেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ভারত ১৯টি, মালয়েশিয়া ২৩টি, থাইল্যান্ড ১২টি এবং ফিলিপাইন ১৯টি আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত। বিপরীতে বাংলাদেশের সংযোগ রয়েছে মাত্র দুটি ক্যাবলে।
ফলে কোনো একটি ক্যাবলে ত্রুটি দেখা দিলে বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংযোগ বন্ধ থাকলে জাতীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
২০২৮ সালেই বড় ঘাটতির শঙ্কা
সরকারের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৬ বাস্তবায়নাধীন। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা পূরণে এটিও যথেষ্ট হবে না। সি-মি-উই-৪-এর কার্যকাল ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত থাকায় ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়ে এখনই পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
তাদের পূর্বাভাস, ২০২৮ সালে ব্যান্ডউইথের ঘাটতি প্রায় ২০ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। ফলে সংকট তৈরি হওয়ার পর নতুন ক্যাবল স্থাপনের উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনীয় সময়ে সক্ষমতা পাওয়া কঠিন হতে পারে।
অবশ্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি) এ ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা নাকচ করেছে। মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সরবরাহে বর্তমানে কোনো ঘাটতি নেই এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণেও তারা প্রস্তুত। একই সঙ্গে সি-মি-উই-৬ চালু হলে দেশের সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বেসরকারি ক্যাবলের দাবি
কর্মশালায় বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদনকে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রস্তাবিত ক্যাবলগুলো চালু হলে প্রায় ৫১ টেরাবিট অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। এতে মোট সক্ষমতা প্রায় ৬৭ টেরাবিটে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।
এতে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং পাইকারি ব্যান্ডউইথের দাম কমার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, দেশে বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব আরও সুরক্ষিত হবে। ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সঙ্গে সেবার মান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে এবং ল্যাটেন্সি কমবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন সাবমেরিন ক্যাবল চালু হলে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি নয়, বরং আইটিসি।
সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বিষয়টি শুধু বর্তমান ব্যান্ডউইথ চাহিদা মেটানোর নয়; বরং ২০৩০ ও ২০৩৫ সালে বাংলাদেশের ডিজিটাল সক্ষমতা কতটা থাকবে, সেটিও এর সঙ্গে জড়িত।
একটি সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পের পরিকল্পনা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও চালু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। তাই সংকট দৃশ্যমান হওয়ার পর উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনীয় সময়ে সমাধান পাওয়া নাও যেতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নতুন সাবমেরিন ক্যাবল নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ইন্টারনেট অবকাঠামো বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। তাদের মতে, সি-মি-উই-৩-এর সুযোগ হারানোর মতো কৌশলগত ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যান্ডউইথ পরিকল্পনা এখনই চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন