মো: মেহেদী হাসান, মনপুরা:ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরার প্রায় দেড় লাখ মানুষের অন্যতম বড় সমস্যা এখন কর্মসংস্থানের সংকট। পর্যাপ্ত শিল্পকারখানা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় শিক্ষিত-অশিক্ষিত উভয় শ্রেণির শত শত তরুণ বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। জীবিকার সন্ধানে অনেকেই পরিবার-পরিজন রেখে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল, এমনকি বিদেশেও পাড়ি জমাচ্ছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় মাছ ধরা ও কৃষিকাজ ছিল মনপুরার মানুষের প্রধান জীবিকা। কিন্তু নদীভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ইলিশ সংরক্ষণে মৌসুমি মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা এবং কৃষিতে নানা সংকটের কারণে সেই আয়ের ক্ষেত্র আগের তুলনায় অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ স্থায়ী কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক সম্পন্ন করা অনেক তরুণ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন। কেউ অল্প আয়ের অস্থায়ী কাজ করছেন, কেউ দিনমজুরি বা মৌসুমি পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। আবার অনেকেই জীবিকার তাগিদে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে চলে যাচ্ছেন। স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে কর্মসংস্থানের অভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ মনপুরা ছেড়ে অন্যত্র স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মনপুরায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, মৎস্যভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, পর্যটন খাতের উন্নয়ন এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে হাজারো তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দ্বীপে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে।
২ নম্বর হাজীরহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. জামাল উদ্দিন বলেন, “মনপুরা দ্বীপে একটি প্রবাসী কল্যাণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হলে স্থানীয় বেকার যুবকদের বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে অনেক তরুণ দক্ষতা অর্জন করে বৈধভাবে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। এতে তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু মুছা বলেন, “মনপুরায় বিদ্যুতের সমস্যার কারণে কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে না। খুব দ্রুত বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হলে এখানে মিল-কারখানা স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে এবং অনেক যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।”
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. নুরনবী জানান, গত তিন বছরে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৭২০ জন তরুণ-তরুণীকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০৮ জন আত্মকর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং তিনজন প্রশিক্ষণ শেষে উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা শুরু করেছেন। তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ, আত্মকর্মসংস্থান, যুব নিবন্ধন কার্যক্রম এবং নতুন দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে আরও বেশি তরুণকে কর্মমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না; প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করতে হবে। অন্যথায় দক্ষ তরুণদেরও জীবিকার সন্ধানে দ্বীপ ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশজুড়েই যুব কর্মসংস্থান একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় পর্যায়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন শিল্পায়নের মাধ্যমে এ সংকট অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক কর্মসংস্থান প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। তাহলে জীবিকার জন্য মনপুরার তরুণদের আর প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে দূর-দূরান্তে পাড়ি জমাতে হবে না।
মন্তব্য করুন