মো. সবুজ: ভোলার লালমোহনে চুরির অভিযোগে চার কিশোরকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তিন দফায় মারধর এবং মাথার চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ওই এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী ৪ কিশোর হলেন, মো. সাইফুল ইসলাম (১৬), মো. সাগর (১৭), মো. ইব্রাহিম (১৭) ও মো. শাওন (১৭)। তারা সবাই লালমোহন উপজেলার চর উমেদ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের খালগোড়া বাজার এলাকার বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ অক্টোবর রাতে উপজেলার গজারিয়া খালগোড়া বাজার এলাকার শাহাজান মিয়ার বাড়ি থেকে দুটি কলস ও একটি চসমান চুরি হয়। পরে একই এলাকার কিশোর সাইফুল ইসলাম চুরি হওয়া কলস ও চসমান বিক্রি করতে গেলে স্থানীয়দের হাতে ধরা পরে। পরে বিষয়টি স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতাকে জানালে তারা এসে সাইফুলের সঙ্গে থাকা তার তিন বন্ধু সাগর, ইব্রাহিম ও শাওনকেও একসঙ্গে তুলে নিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্মম নির্যাতন করেন।
অভিযুক্তরা হলেন, একই এলাকার চৌকিদার বাড়ির বাহাদুর চৌকিদার (৩৫), মন্নান চৌকিদার (৪০) ও জাকির পাস্তানসহ (৪০) আরো কয়েকজন। তারা ওই ইউনিয়ন যুবদলের বিভিন্ন পদে রয়েছেন বলেও জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, চুরির ঘটনায় সাইফুল জড়িত থাকলেও বাকি তিন কিশোরের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। শুধু সাইফুলের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকায় তাদেরও একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তিন দফায় মারধর করা হয়। একপর্যায়ে চার কিশোরের মাথার চুলও কেটে দেন ওই বিএনপি নেতারা।
ভুক্তভোগী সাগর জানান, সাইফুল তার বন্ধু হওয়ায় তার সঙ্গে চলাফেরা করতেন। তবে সাইফুল চুরি করেছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। শুক্রবার সন্ধ্যায় তারা কয়েকজন মিলে আড্ডা দেওয়ার সময় হঠাৎ সাইফুলসহ চারজনকে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতা তুলে নিয়ে যান। পরে তাদের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়।
সাগরের বাবা আলমগীর মিয়া জানান, ছেলেকে মারধরের পর তাকে ঘটনাস্থলে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে স্থানীয় নেতারা তাকেও ছেলেকে মারধর করতে বলেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতির চাপে তিনি নিজ হাতেই ছেলেকে মারধর করেন। তবে এরপরও তার ছেলেকে রেহাই দেয়নি। কেটে দেওয়া হয় মাথার চুল।
আলমগীর মিয়ার দাবি, তার ছেলে চুরির ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত ছিল না। শুধু সাইফুলের বন্ধু হওয়ার কারণেই তাকে ধরে এনে মারধর ও অপমান করা হয়েছে। এঘটনায় তিনি অভিযুক্তদের উপযুক্ত বিচারের দাবী জানিয়েছেন।
অভিযোগের দ্বায় স্বীকার করে অভিযুক্ত বাহাদুর জানান, ওই ৪ কিশোর দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চুরির ঘটনা ঘটাচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৪ কিশোর করে ধরে এনে তাদের মারধর করা হয়েছে। এছাড়াও হালকা করে তাদের চুল কেটে দেওয়া হয়েছে যাতে আর কখনো চুরি না করে।
এদিকে ঘটনার পর ওই এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিচারের নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলের।
তাদের দাবী, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে মারধর, আটকে রাখা কিংবা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার সুযোগ নেই। চুরির অভিযোগ থাকলেও কাউকে নির্যাতন বা অপমান করার অধিকার কারও নেই। কেউ অপরাধ করলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে। কিন্তু বিচারের নামে কাউকে লাঞ্ছিত করা আরেক অপরাধ। এসময় এঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী জানিয়েছেন তারা।
এদিকে ঘটনার পর লালমোহন থানা পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এছাড়াও ঘটনাটি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস দেন পুলিশ।
এছাড়াও ভুক্তভোগী সাগরের বাবা আলমগীর মিয়া বাদী হয়ে লালমোহন থানায় ৪ জনকে আসামী করে একটি এজাহার দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
লালমোহন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
মন্তব্য করুন