ভোলা প্রতিনিধি: সারাদেশের মতো ভোলা পৌর এলাকাতেও দিন দিন বাড়ছে মশার উপদ্রব। মশার কামড়ে জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। এর মধ্যে ডেঙ্গুর শঙ্কাও বাড়ছে। তবে মশা নিধন, প্রজননস্থল ধ্বংস, ড্রেন পরিষ্কার ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে পৌরসভার দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকার অভিযোগ করেছেন পৌরবাসী।
পৌরবাসীর অভিযোগ, প্রায় ছয়-সাত মাস আগে পৌরসভার পক্ষ থেকে এক-দুবার ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ও ওষুধ ছিটানো হলেও এরপর আর তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। ফলে বিভিন্ন এলাকার ড্রেন, রাস্তার পাশ ও জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন বাড়ছে।
সরেজমিনে ভোলা পৌরসভার আবহাওয়া অফিস রোড, পৌর ভূমি অফিস রোড, ভদ্রপাড়া, গাজীপুর রোড, উকিলপাড়া, নূর মসজিদ রোড, মুসলমানপাড়া ও রিজার্ভ পুকুরপাড়সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক ড্রেনে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা ও জমে থাকা পানির মধ্যে মশার লার্ভা রয়েছে। আশপাশে উড়ছে অসংখ্য ছোট-বড় মশা। বিভিন্ন সড়কের পাশেও পড়ে আছে দীর্ঘদিনের ময়লা ও বর্জ্য। কোথাও কোথাও জমে আছে বৃষ্টির পানি।
মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে অনেক বাসিন্দাকে ঘরে সারাদিন কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে দেখা গেছে। বিশেষ করে বিকেল ও সন্ধ্যার পর মশার উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় একসঙ্গে দুই-তিনটি কয়েল জ্বালিয়ে বসে থাকছেন অনেকে।
রিজার্ভ পুকুর সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা কুলসুম বেগম ও হালিমা আক্তার বলেন, ‘বাড়িতে মশার উৎপাত বেড়ে গেছে। মশার জ্বালায় বসে থাকা যায় না। মশারি টানানোর পরও মশা ভেতরে ঢুকে শিশুদের কামড় দেয়। এতে অনেক সময় হাত-পা ফুলে যায়।’
তারা বলেন, ‘সারাদিন ঘরে কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। সন্ধ্যার আগে থেকেই মশা বেড়ে যায়। তখন দুই-তিনটি কয়েল জ্বালিয়ে রাখি। কয়েলের ধোঁয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর জানলেও মশার কারণে কিছু করার নেই। পৌরসভা থেকেও অনেক মাস ধরে ধোঁয়া বা ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না।’
উকিলপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও ভোলা জেলা সুজনের সভাপতি মোবাশ্বের উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘ছয়-সাত মাস আগে আমাদের এলাকায় পৌরসভা থেকে ওষুধ ছিটানো হয়েছিল। এরপর আর কোনো কার্যক্রম দেখিনি। অবসর সময়ে বাড়িতে বই পড়ি। মশার কয়েল জ্বালিয়ে ও ফ্যান চালিয়েও মশার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। ঘরে বসে খাওয়া-দাওয়ার সময়ও মশার কামড়ে স্বস্তি পাওয়া যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে মানুষকে সতর্ক করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পৌরসভার দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু ভোলায় ডেঙ্গু ও এডিস মশা নিধনে দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। ড্রেনও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না।’
ভদ্রপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. কবির হোসেন বলেন, ‘সন্ধ্যার পর মশার কারণে ঘরে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাইরেও একই অবস্থা। আশপাশের খোলা ড্রেনগুলো বছরের পর বছর পড়ে থাকলেও পরিষ্কার করার উদ্যোগ দেখা যায় না।’
পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের উপজেলা সড়কের বাসিন্দা মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘গত বছর শীতের পর একবার পৌরসভা থেকে ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর দেওয়া হয়নি। বর্তমানে মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় বসতঘরে থাকাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। মশার কামড়ে অনেকের জ্বর হয়েছে। কারও কারও ডেঙ্গু হয়েছে বলেও শুনেছি।’
আবহাওয়া অফিস রোডের বাসিন্দা মো. জামাল হোসেন বলেন, ‘সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মশা তুলনামূলক কম থাকে। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা মশার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বর্তমানে পৌরসভা থেকে সরকারি অফিসগুলোতে ধোঁয়া ও ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে তেমন কোনো কার্যক্রম নেই।’
রিজার্ভ পুকুরপাড়ের বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিক মো. রাহিম ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে সারাদেশের মতো ভোলাতেও মশা ও ডেঙ্গুর শঙ্কা বাড়ছে। প্রতিদিনই মশার কামড়ে মানুষের জ্বর হচ্ছে। কারও কারও ডেঙ্গুও হয়েছে। কয়েকদিন আগে আমার এক বন্ধুর ভাই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসা নিতে গিয়ে মারা গেছেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর মশা নিধনের জন্য পৌরসভার বাজেট থাকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা বাজেট করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তেমন কার্যক্রম চোখে পড়েনি। ধোঁয়া-ওষুধ ছিটানো, ড্রেন পরিষ্কার, সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ বা মাইকিং—কোনোটিই নিয়মিত দেখা যায়নি। প্রায় সাত-আট মাস আগে নামমাত্র ধোঁয়া ও ওষুধ ছিটানো হয়েছিল।’
তার প্রশ্ন, ‘গত অর্থবছরের এত টাকা কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, তা পৌরবাসী জানতে চায়।’
পৌরবাসীর অভিযোগ, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিধনের জন্য ভোলা পৌরসভা ৪৫ লাখ টাকা বাজেট করেছিল। এর মধ্যে কাগজে-কলমে মশা নিধন কার্যক্রমে ৪১ লাখ ২২ হাজার ৯০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মশা নিধনের জন্য আরও ১৮ লাখ টাকা বাজেট রাখা হয়েছে।
তবে সরেজমিনে ২০২৫-২৬ ও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মশা নিধনের কার্যক্রমের দৃশ্যমানতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পৌরবাসী। তাদের দাবি, নিয়মিত মশক নিধন, ড্রেন পরিষ্কার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
এদিকে অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভোলা পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. বেলাল হোসেন।
তিনি বলেন, ‘আমি এ বছরের এপ্রিল থেকে ভোলা পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছি। ফলে আগের অনেক বিষয় আমার জানা নেই। গত অর্থবছরে যে ওষুধ কেনা হয়েছে, আমার জানামতে তা এখনও মজুত রয়েছে। ওষুধ যথাযথ নিয়মেই কেনা হয়েছে।’
মশা নিধন ও ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রমে ধীরগতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বছর অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে মশা নিধন ও ড্রেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। এতে বিভিন্ন এলাকায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে মশা নিধন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।’
এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে দ্রুত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ড্রেন পরিষ্কার এবং নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন পৌরবাসী।
তথ্য সূত্র ঃ জাগো নিউজ বিডি
মন্তব্য করুন