নিজস্ব প্রতিবেদক: পূর্ব লন্ডনের একটি ভবন, যেখানে একসময় চলত মদ্যপান ও আড্ডা, সেই ভবনেই এখন প্রতিধ্বনিত হয় আজান ও পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত। যেখানে একসময় মদের বারের পরিবেশ ছিল, সেখানে এখন কাতারবদ্ধ হয়ে সালাত আদায় করেন হাজারো মুসল্লি।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছেন লন্ডনপ্রবাসী ব্যবসায়ী ও চট্টগ্রামের রাউজানের সন্তান জিয়া বিন রাসেল। তিনি ভবনটি কিনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে সেটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ মসজিদ ও মুসলিম কমিউনিটি সেন্টারে রূপান্তর করেন। বর্তমানে ভবনসহ সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির বাজারমূল্য ৪.৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি বলে জানা গেছে।
তবে মদের বারকে মসজিদে রূপান্তরের এই উদ্যোগই তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের একমাত্র উদাহরণ নয়। বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল—দীর্ঘদিন ধরে নীরবে-নিভৃতে বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করে আসছেন তিনি।
প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য এককালীন খাদ্য সহায়তা কিংবা হুইলচেয়ার বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি জিয়া বিন রাসেল। তাঁদের দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করে তুলতে দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
এই লক্ষ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সাভারের নবীনগরে ‘হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ উদ্যোগের পরিকল্পনা ও অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে জিয়া বিন রাসেলের।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তিনি। বিভিন্ন এলাকায় অসহায় ও দরিদ্র নারীদের মধ্যে সেলাই মেশিন, নগদ অর্থ এবং বিভিন্ন আয়মুখী উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অনেক পরিবারের স্থায়ী আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ধর্মীয় মূল্যবোধ ও দ্বীনি শিক্ষার প্রসারেও রয়েছে তাঁর নানা উদ্যোগ। দেশের দুর্গম অঞ্চলের মক্তব ও মাদ্রাসাগুলোতে নিয়মিত অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করে আসছেন তিনি।
তাঁর অর্থায়নে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। একই সঙ্গে একাধিক শিক্ষার্থী পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করে হাফেজ হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মানবিক কার্যক্রমেও সহযোগিতা করছেন জিয়া বিন রাসেল। যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা এবং মানবিক সংকটে থাকা সুদানের মানুষের জন্য বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রমে অর্থায়ন করছেন তিনি।
যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের জন্য রান্না করা খাবার, রুটি, বিশুদ্ধ পানি এবং জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার বিভিন্ন প্রকল্পে তাঁর সহযোগিতা রয়েছে বলে জানা গেছে।
দেশের বিভিন্ন দুর্যোগময় পরিস্থিতিতেও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এই উদ্যোক্তা। বিশেষ করে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যাকবলিত ও পানিবন্দী মানুষের কাছে খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে তিনি সহযোগিতা করেছেন।
জিয়া বিন রাসেল হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশের অন্যতম অভিভাবক ও সম্মানিত উপদেষ্টা হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ব্যক্তিগত প্রচার পাওয়া তাঁর এসব কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য নয়। বরং সমাজের অন্যান্য সামর্থ্যবান মানুষকে মানবকল্যাণে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করতেই তাঁর নীরব মানবিক কাজগুলো সামনে আনা হচ্ছে।
রাউজান থেকে লন্ডন—জিয়া বিন রাসেলের জীবনের এই পথচলা দেখিয়ে দেয়, ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে নিজের সামর্থ্য কাজে লাগানোও হতে পারে জীবনের অন্যতম বড় অর্জন।
মন্তব্য করুন