স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে সর্বনিম্ন গ্রেডে চাকরি শুরু করা একজন চাকরিজীবীর হাতে মাসের শুরুতে মূল বেতন হিসেবে আসত ১৩০ টাকা। একই সময়ে সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ গ্রেডে মূল বেতন ছিল ২ হাজার টাকা। সেই ১৩০ টাকা দিয়ে শুরু হওয়া বেতনযাত্রা ৫৩ বছর পর এসে পৌঁছাবে ২০ হাজার টাকায়। আর ২ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ মূল বেতন এখন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। ‘ন্যাশনাল স্কেলস অব পে-১৯৭৩’ নামে ওই বেতন স্কেলে ছিল ১০টি গ্রেড বা ধাপ। তবে ওপরের প্রথম চারটি গ্রেডের বেতন বাস্তবায়ন করা হয়নি। সর্বোচ্চ ধাপে শুরুর মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ হাজার টাকা। সর্বনিম্ন ধাপে চাকরি শুরু করা একজনের মূল বেতন ছিল ১৩০ টাকা।
এরপর বদলেছে সময়, বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, আর ধাপে ধাপে পরিবর্তন এসেছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয়।
১৯৭৭ সালে নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন করা হয় ২২৫ টাকা। ইনক্রিমেন্ট পেয়ে তা ৩১৫ টাকা পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ ছিল। সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ৩ হাজার টাকা। তখন ২১টি গ্রেডে বেতন নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছিল।
আরও আট বছর পর, ১৯৮৫ সালের বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন বেড়ে হয় ৫০০ টাকা। ইনক্রিমেন্ট পেয়ে তা ৮৬০ টাকা পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ ছিল। ২০টি গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করা ওই স্কেলে সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার টাকা।
১৯৯১ সালে আবার বদলে যায় বেতন কাঠামো। ‘জাতীয় বেতন স্কেল, ১৯৯১ (সরকারি-বেসরকারি)’-এ ২০টি গ্রেড ছিল। সর্বনিম্ন গ্রেডে চাকরির শুরুতে মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ৯০০ টাকা। ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়ে তা ১ হাজার ৫৩০ টাকা পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ ছিল। সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ছিল ১০ হাজার টাকা। এই বেতন ছিল নির্ধারিত, অর্থাৎ এর বেশি হওয়ার সুযোগ ছিল না।
১৯৯৭ সালের জুলাই থেকে কার্যকর হয় নতুন বেতনকাঠামো। সর্বনিম্ন গ্রেডে চাকরির শুরুতে মূল বেতন করা হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। ইনক্রিমেন্ট পেয়ে তা ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত যেতে পারত। সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ১৫ হাজার টাকা।
এরপর আসে ২০০৫ সাল। এই বেতনকাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় ২ হাজার ৪০০ টাকা। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে সর্বোচ্চ গ্রেডে। প্রথমবারের মতো সরকারি চাকরিতে সর্বোচ্চ মূল বেতন ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। প্রথম গ্রেডের বেতন ৫৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার টাকা।
২০০৯ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার ১০০ টাকা। সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন করা হয় ৪০ হাজার টাকা। এটিও ছিল নির্ধারিত বেতন।
২০১৫ সালে বেতন কাঠামোয় আবার বড় পরিবর্তন আসে। ২০তম গ্রেডে চাকরির শুরুতে মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার ২৫০ টাকা। ইনক্রিমেন্ট পেয়ে তা ২০ হাজার ১০ টাকা পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ ছিল। আর গ্রেড-১-এর একজন কর্মকর্তার মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ৭৮ হাজার টাকা। তারপর কেটে গেছে প্রায় এক দশক।
এবার ২০২৬ সালের নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোয় এসে সেই দীর্ঘ যাত্রায় যোগ হলো আরেকটি বড় অধ্যায়। নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডে চাকরির শুরুতে মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। প্রথম গ্রেডে মূল বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন এবারই প্রথম লাখ টাকা ছাড়াল।
হিসাব করলে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের ১৩০ টাকা থেকে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকায় পৌঁছাতে বেড়েছে প্রায় ১৫৪ গুণ। অন্যদিকে সর্বোচ্চ মূল বেতন ২ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায় পৌঁছেছে, অর্থাৎ বেড়েছে ৭৮ গুণ।
নতুন বেতনকাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়বে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। গত সোমবার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। মূল বেতন, ভাতাসহ মোট চার ধাপে এই বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। এটি গত জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
তবে সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক সুবিধা শুধু মূল বেতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মূল বেতনের নির্দিষ্ট হারে বাড়িভাড়া দেওয়া হয়। গ্রেড ও এলাকাভেদে এই ভাতার পরিমাণে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। বাড়িভাড়ার বাইরে সবার জন্য রয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা।
এর সঙ্গে রয়েছে সন্তানের জন্য শিক্ষাসহায়ক ভাতা, উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা এবং সরকারি দায়িত্ব ও যাতায়াতের জন্য টিএ বা ডিএসহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধা। নতুন বেতনকাঠামোয় সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মুঠোফোন ভাতাও যুক্ত করা হয়েছে। বেতন গ্রেড অনুযায়ী এসব ভাতা নির্ধারণ করা হবে।
অর্থাৎ ৫৩ বছর আগে ১৩০ টাকা দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে সেই বেতনযাত্রার সর্বনিম্ন অঙ্ক দাঁড়াবে ২০ হাজার টাকা। আর ২ হাজার টাকা থেকে শুরু হওয়া সর্বোচ্চ মূল বেতন এখন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
মন্তব্য করুন