দেশের স্থলভাগে সিলেটের পর অন্যতম সম্ভাবনাময় গ্যাস অঞ্চল ভোলা। ১৯৯৫ সালে বোরহানউদ্দিনে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর কেটে গেছে ৩১ বছর। এর মধ্যে ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত হয়েছে ভোলা নর্থ গ্যাসক্ষেত্র। ভোলায় এখন পর্যন্ত নয়টি কূপ খনন করে প্রতিটিতেই গ্যাসের সন্ধান মিলেছে। অথচ দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভোলার অতিরিক্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়নি।
দেশে যখন গ্যাসের তীব্র সংকট, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে, তখন সম্ভাবনাময় ভোলার গ্যাসের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো এবং জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের অবকাঠামো তৈরি করা গেলে দেশের গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ভোলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে। বর্তমানে এলএনজি থেকে দৈনিক প্রায় ৮৫০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৫২৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় বর্তমানে থাকা কূপগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। নতুন কূপ খননের সুযোগও রয়েছে।
আরও ২০টি কূপ খনন করে প্রতিটি থেকে দৈনিক গড়ে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে অতিরিক্ত প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন সম্ভব হতে পারে। বিদ্যমান অব্যবহৃত গ্যাসের সঙ্গে তা যুক্ত হলে ভোলা থেকে দৈনিক প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ভোলায় গ্যাসের মজুদ বাড়াতে নতুন করে ১০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভোলা নর্থ-৫ মূল্যায়ন কূপ, ভোলা নর্থ-৬ ও ৭ অনুসন্ধান কূপ এবং শাহবাজপুর-৯ মূল্যায়ন ও শাহবাজপুর-১০ অনুসন্ধান কূপ।
এসব কূপের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর বাইরে আরও পাঁচটি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাপেক্সের হিসাবে, প্রতিটি কূপ থেকে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে নতুন ১০টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন সম্ভব হবে। বিদ্যমান অব্যবহৃত গ্যাস যুক্ত করলে ভোলা থেকে দৈনিক প্রায় ২৭০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বাপেক্সের নিজস্ব রিগ ও জনবল দিয়ে কাজ করলে বছরে চারটির বেশি কূপ খনন করা কঠিন হতে পারে। এ কারণে গ্যাস সংকট বিবেচনায় বাপেক্সের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিকে কাজে যুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ভোলার অধিকাংশ কূপ এরই মধ্যে রাশিয়ার গ্যাজপ্রম খনন করেছে।
১৯৯৫ সালে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পরই ভোলার ভূগর্ভে উল্লেখযোগ্য গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়। কিন্তু আবিষ্কারের পরও উৎপাদন শুরু করতে লেগে যায় ১৪ বছর। ২০০৯ সালে শাহবাজপুর থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়।
এরপর ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত হয় ভোলা নর্থ গ্যাসক্ষেত্র। দীর্ঘদিন চাহিদা না থাকায় ভোলা নর্থের প্রসেস প্ল্যান্টও তৈরি করা হয়নি। বর্তমানে প্ল্যান্টটির কাজ চলমান থাকলেও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসের চাহিদা তৈরি হওয়ার আগেই উৎপাদন ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে ভোলার গ্যাস এতদিনে জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারত।
ভোলার গ্যাসের সম্ভাবনা শুধু বর্তমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। বাপেক্সের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ ও মুলাদী এলাকাতেও নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ভোলা নর্থ গ্যাসক্ষেত্রের উত্তর পাশে ওই দুই এলাকায় ৩ হাজার ২২০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ চালিয়েছে বাপেক্স। সম্প্রতি সেই জরিপের ফল পাওয়া গেছে। এতে দেখা গেছে, মুলাদী ও মেহেন্দীগঞ্জের ভূগঠনের সঙ্গে ভোলা নর্থের ভূগঠনের মিল রয়েছে।
বাপেক্সের ভূপদার্থিক বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক আব্দুল হালিম জানিয়েছেন, জরিপের ফল ভালো এসেছে। স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে একটি কূপ খননের সম্ভাব্য স্থানও চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এখনো এ বিষয়ে প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি তৈরি হয়নি।
এর আগে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে মুলাদীতে দুটি কূপ খনন করা হয়েছিল। তখন গ্যাস পাওয়া যায়নি। তবে নতুন ভূতাত্ত্বিক জরিপে একই এলাকায় আবারও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
ভোলার উপকূলীয় চরফ্যাশন, মনপুরা ও হাতিয়া এলাকাতেও দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। এসব এলাকার ভূগঠনের সঙ্গে ভোলার বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা জানতে ত্রিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ লক্ষ্যে চরফ্যাশনে ‘থ্রিডি সিসমিক সার্ভে ওভার চরফ্যাশন’ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। অর্থায়নের অনুমতির পর সংশোধিত ডিপিপিও পেট্রোবাংলায় পাঠানো হয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, ভোলা ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থলভাগে বড় ধরনের গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। ভোলায় নয়টি কূপ খনন করে প্রতিটিতেই গ্যাস পাওয়া গেছে। ভোলা ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় আরও গ্যাসের মজুদ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণেই চরফ্যাশনে ত্রিমাত্রিক জরিপ করা হচ্ছে।
বর্তমানে ভোলায় প্রমাণিত গ্যাসের মজুদের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। নতুন কূপ খনন করা হলে এই মজুদের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছে বাপেক্স।
তবে শুধু মাটির নিচে মজুদ থাকলেই হবে না—সেই গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহের জন্য প্রয়োজন কার্যকর অবকাঠামো। বর্তমানে ভোলার সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই।
দীর্ঘসূত্রতার মধ্যেই দেশে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমেছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের দিকে দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হতো। বর্তমানে তা প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে।
একই সময়ে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। ফলে ঘাটতি পূরণে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ভোলার গ্যাস নিয়ে পাঁচ বছর আগেই জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হলে এতদিনে দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস পাওয়া সম্ভব হতে পারত।
বর্তমানে ভোলার গ্যাস দিয়ে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, তিনটি ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র, সাতটি শিল্পকারখানা এবং আবাসিক গ্রাহকের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত গ্যাস মূল ভূখণ্ডে নেওয়ার মতো কার্যকর অবকাঠামো এখনো তৈরি হয়নি।
ভোলা-বরিশাল-খুলনা গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পাশাপাশি গ্যাসকে সিএনজি বা এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এর আগে ভোলার গ্যাস সিএনজি করে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একটি বেসরকারি কোম্পানিকে প্রতিদিন ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সিএনজি করে সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসও সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
এলএনজি আকারে গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন বড় ধরনের অবকাঠামো ও বিনিয়োগ। ভোলায় এলএনজি অবকাঠামো এবং মূল ভূখণ্ডে রিগ্যাসিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ফলে এ পদ্ধতি ব্যয়বহুল।
এ কারণে বিশেষজ্ঞরা ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নিতে পাইপলাইন নির্মাণকেই তুলনামূলকভাবে কার্যকর পথ হিসেবে দেখছেন। তবে শুধু পাইপলাইন নির্মাণ করলেই হবে না; একই সঙ্গে গ্যাস উৎপাদনও বাড়াতে হবে।
মুলাদী-মেহেন্দীগঞ্জ ও চরফ্যাশনে নতুন গ্যাসের সন্ধান মিললে সেই গ্যাসও পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। অন্যথায় বড় অর্থ ব্যয়ে নির্মিত পাইপলাইন পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে ভবিষ্যতে অলস অবকাঠামোয় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতিকুজ্জামান বলেন, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নেওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা প্রয়োজন। সিএনজি করে গ্যাস আনার আগের সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না। পাইপলাইন ও এলএনজি—দুই বিকল্পের মধ্যে কোনটি বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদে কতটা গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।
ভোলার গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসকে যুক্ত করার বিষয়েও আশাবাদী সরকার।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এরপর পেট্রোনাসের সঙ্গে অনলাইন বৈঠক হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদলও মালয়েশিয়া সফর করেছে।
সরকারের আশা, পেট্রোনাসের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে ভোলার গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে নতুন গতি আসতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া মনে করেন, ভোলার গ্যাসের সম্ভাবনাকে আরও বড় পরিসরে দেখা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, শাহবাজপুর এলাকায় ভূগর্ভে যে ভাঁজ পর্বত রয়েছে, পূর্ব দিকে নোয়াখালী হয়ে মহেশখালী পর্যন্ত একই ধরনের ভূগঠন রয়েছে। তাই ভোলা থেকে নোয়াখালী ও মহেশখালী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাকে দেশের দ্বিতীয় গ্যাস হাব হিসেবে বিবেচনা করে অনুসন্ধান জোরদার করা যেতে পারে।
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বাড়ছে। শিল্প, বিদ্যুৎ ও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ভোলার সম্ভাবনাকে আর দীর্ঘদিন অব্যবহৃত রাখার সুযোগ নেই।
একদিকে নতুন কূপ খনন, অন্যদিকে মুলাদী-মেহেন্দীগঞ্জ ও চরফ্যাশনে অনুসন্ধান এবং পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য পাইপলাইন নির্মাণ—এই তিনটি কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
ভোলার ভূগর্ভে থাকা গ্যাস দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
৩১ বছর আগে যে সম্ভাবনার দরজা খুলেছিল, এখন প্রশ্ন একটাই—ভোলার মাটির নিচে থাকা গ্যাস আর কতদিন মাটির নিচেই পড়ে থাকবে?
মন্তব্য করুন