ভোলা প্রতিনিধি: দেশের চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে নতুন করে ভোলা-বরিশাল-খুলনা গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতিও চলছে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আনুমানিক তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, ভোলার গ্যাস স্থলভাগে এনে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সম্ভাব্যতা জরিপ ও দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে। ভোলায় এ পর্যন্ত নয়টি কূপ খনন করা হয়েছে এবং প্রতিটি কূপেই গ্যাসের সন্ধান মিলেছে। ভোলা ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় আরও গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে। এর বড় একটি অংশ নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মাণ করতে হতে পারে। ফলে প্রকল্পের ব্যয় সাধারণ স্থলভাগের পাইপলাইনের তুলনায় বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খুলনা পর্যন্ত গ্যাস গ্রিড সম্প্রসারণ করা গেলে ভবিষ্যতে এই গ্যাস দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
১৯৯৫ সালে ভোলার বোরহানউদ্দিনে গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার পর প্রায় ৩১ বছর পেরিয়ে গেলেও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়নি জেলার গ্যাস। বিভিন্ন সময়ে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এর আগে ভোলা-বরিশাল-খুলনা এবং পরে ভোলা-বরিশাল-ঢাকা রুটে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সম্ভাব্যতা যাচাইও করা হয়। তবে কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি। এবার আবার ভোলা-বরিশাল-খুলনা রুটকে সামনে রেখে নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় এ পর্যন্ত তিনটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আনুমানিক ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোলায় খনন করা নয়টি কূপের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি কূপ উৎপাদনযোগ্য। এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। বাকি চারটির মধ্যে একটি কূপের পাইপলাইন এবং তিনটির প্রসেস প্ল্যান্ট প্রস্তুতের কাজ চলছে।
তবে স্থানীয় চাহিদা সীমিত হওয়ায় বর্তমানে ভোলা থেকে দৈনিক প্রায় ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। পাইপলাইন না থাকায় এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ নেই।
ভোলায় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে আরও ১০টি কূপ খননের পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। এর মধ্যে কয়েকটি কূপ খননের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বাপেক্সের হিসাব অনুযায়ী, নতুন ১০টি কূপ থেকে গড়ে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস পাওয়া গেলে দৈনিক আরও প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন সম্ভব হবে। বর্তমানে অব্যবহৃত গ্যাস যুক্ত হলে ভবিষ্যতে ভোলা থেকে দৈনিক প্রায় ২৭০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোলার কয়েকটি গ্যাসকূপ খনন করেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম।
ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন নির্মাণে প্রকল্প ব্যয় কত হবে, তা সম্ভাব্যতা জরিপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। তবে নদীর তলদেশ দিয়ে পাইপলাইন নির্মাণের প্রয়োজন হওয়ায় ব্যয় তুলনামূলক বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম-ফৌজদারহাট-বাখরাবাদ ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের ১৮১ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণে ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ৪৭৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ওই প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তবে ভোলা-বরিশাল-খুলনা রুটে নদীপথে পাইপলাইন নির্মাণ এবং বর্তমানে নির্মাণসামগ্রী ও ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ব্যয় আরও বেশি হতে পারে।
দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহের একটি বড় অংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। অন্যদিকে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমেই কমছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, ভোলার গ্যাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেরি হয়েছে। পাইপলাইন নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হওয়ায় এখন কাজ শুরু করলেও সুফল পেতে কয়েক বছর সময় লাগবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর আগে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বর্তমান গ্যাস সংকট কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতো। এখন দেশে জ্বালানির চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় ভোলার গ্যাসের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
ভবিষ্যতে নতুন কূপ খননের মাধ্যমে ভোলায় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো গেলে জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় এ অঞ্চলের গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উৎপাদনের পাশাপাশি দ্রুত ও টেকসই পরিবহন অবকাঠামো নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য করুন