চ্যানেল ভোলা: বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে হামের টিকা চালুর পর এত বিপুলসংখ্যক শিশুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট ৬৭৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯৩ জন এবং হামের উপসর্গে মারা গেছে ৫৮৪ জন। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে এক লাখেরও বেশি শিশু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ হলো টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, যার ফলে শিশুদের মধ্যে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সমষ্টিগত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে টিকার সংকট, ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনে বিলম্ব, টিকাদানের আওতা কমে যাওয়া এবং অপুষ্টির কারণে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, গত ৩০-৩৫ বছরে মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল যে হামেও মৃত্যু হতে পারে। তিনি জানান, আগে দেশে হার্ড ইমিউনিটি থাকায় অনেক শিশু জন্মগতভাবেই কিছুটা সুরক্ষা পেত। কিন্তু টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় সেই সুরক্ষা ভেঙে পড়েছে।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, “দেশে হামের টিকা চালু হওয়ার পর এত শিশুমৃত্যুর নজির নেই। টিকার ঘাটতি এবং দুর্বল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাই এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ মনে করেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় হামের প্রাদুর্ভাবকে মহামারি ঘোষণা করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, মহামারি ঘোষণা করা হলে জরুরি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিশেষ বাজেট, চিকিৎসা নির্দেশিকা ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহজ হতো।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত শিশুদের দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া, নিউমোনিয়াসহ জটিলতা বৃদ্ধি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধার অভাবও মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১০ হাজার ৯৪৯ জন। এছাড়া সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ৯১ হাজার ৭৮৯ জন। হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৫ হাজার ৯০২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৭১ হাজার ৯৭০ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা, ভিটামিন-এ সরবরাহ নিশ্চিত করা, অপুষ্টি মোকাবিলা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
মন্তব্য করুন