চ্যানেল ভোলা: দ্বীপজেলা ভোলায় প্রায় তিন দশক আগে বিপুল গ্যাসের সন্ধান মিললেও সময়োপযোগী পরিকল্পনার অভাবে গড়ে ওঠেনি প্রত্যাশিত গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়ন। ফলে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের বড় অংশ কার্যত অলস পড়ে রয়েছে। নতুন আরও দুটি গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মিললেও শিল্প প্রতিষ্ঠানের অভাবে গ্যাসের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বড় সম্ভাবনা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে ভোলাবাসী।
তবে
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ভোলায় ‘শিল্পপার্ক’ স্থাপনের ঘোষণাকে ঘিরে নতুন করে আশার আলো দেখছেন জেলার মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, অতীতের মতো আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে এবার
বাস্তবায়িত হবে গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়নের স্বপ্ন।
তিন
দশকের গ্যাস, সীমিত ব্যবহার
১৯৯৫
সালে ভোলার বোরহানউদ্দিনে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। প্রায় দুই
ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত থাকা এ ক্ষেত্র থেকে
২০০৯ সালে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়।
বর্তমানে
শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির মাধ্যমে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, সাতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ২ হাজার ৩৪৪টি
আবাসিক সংযোগ এবং সিএনজি খাতে মিলিয়ে প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৭০ থেকে ৭৫
মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। ঢাকায় সিএনজি হিসেবে পাঠানো হচ্ছে আরও প্রায় ১ মিলিয়ন ঘনফুট।
ফলে প্রতিদিন প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট
গ্যাস উদ্বৃত্ত থাকছে।
এদিকে
২০১৮ সালে আবিষ্কৃত ভোলা নর্থ এবং ২০২৩ সালে আবিষ্কৃত ইলিশা-১ গ্যাসক্ষেত্র থেকে
এখনও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়নি। বর্তমানে আরও দুটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগের আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া আবুল উলাইয়া টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, প্রাণ-আরএফএলসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাজও এগিয়ে চলছে।
প্রতিশ্রুতি
ছিল, বাস্তবায়ন হয়নি
গ্যাসভিত্তিক
সার কারখানা, ইপিজেড, এলএনজি টার্মিনাল কিংবা জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ—বিগত বছরগুলোতে এমন নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে সেগুলোর কোনোটি বাস্তবায়িত হয়নি।
স্থানীয়দের
দাবি, পাইপলাইনের মাধ্যমে অন্যত্র গ্যাস নেওয়ার পরিবর্তে ভোলাতেই শিল্পকারখানা স্থাপন করলে কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক উন্নয়ন
নিশ্চিত হবে।
স্থানীয়দের
প্রত্যাশা
কনজ্যুমার
অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
ভোলা জেলা সভাপতি মো. সোলাইমান বলেন, শিল্প স্থাপনের জন্য ভোলায় প্রয়োজনীয় পরিবেশ রয়েছে। অতীতে বহু উদ্যোক্তা এলেও সরকারি সমন্বয় ও কার্যকর উদ্যোগের
অভাবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হয়নি।
উন্নয়নকর্মী
মো. ইকরামুল আলম বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে
শুধু আশ্বাসই পাওয়া গেছে। বাস্তবে শিল্পায়নের কোনো অগ্রগতি হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু প্রভাবশালী মহল জমির দাম বাড়িয়ে উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সিন্ডিকেট
দমন করার দাবি জানান তিনি।
গণমাধ্যমকর্মী
আবদুর রহমান হেলাল বলেন, ভোলায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নৌপথ—সব
ধরনের সুবিধা রয়েছে। তাই শিল্পপার্ক দ্রুত বাস্তবায়ন সময়ের দাবি।
রাজনৈতিক
নেতাদের বক্তব্য
জেলা
বিএনপির সদস্য সচিব মো. রাইসুল আলম বলেন, ভোলার উন্নয়নের অন্যতম প্রধান দাবি গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়ন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর শিল্পপার্ক ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত কাজ শুরুর আহ্বান জানান।
ভোলা
চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড
ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও জেলা পরিষদ
প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ভোলার গ্যাস খুলনা বা বরিশালে নিয়ে
শিল্পায়ন করার চেয়ে ভোলাতেই শিল্প গড়ে তোলা অধিক ব্যয় সাশ্রয়ী হবে। তিনি জানান, শুধু বরিশাল পর্যন্ত গ্যাস নিতে প্রায় ১ হাজার ১০০
কোটি টাকা ব্যয় হবে। সেই অর্থ ভোলার শিল্পায়নে বিনিয়োগ করলে দেশ ও জনগণ উভয়ই
লাভবান হবে।
জেলা
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য সচিব ও প্রবীণ ব্যবসায়ী
আমিনুল ইসলাম খান বলেন, সম্পদের তুলনায় ভোলা এখনও উন্নয়নে পিছিয়ে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিল্পপার্ক বাস্তবায়নের মাধ্যমে জেলার অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।
প্রশাসনের
প্রস্তুতি
জেলা
প্রশাসক ডা. শামিম রহমান বলেন, গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়ন ভোলাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। শিল্পপার্ক বাস্তবায়নে জমি বরাদ্দসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি রয়েছে। ছোট শিল্পের পাশাপাশি ভারী শিল্প স্থাপনেরও সুযোগ রয়েছে। দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বপ্ন
বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ভোলাবাসী
গ্যাসের
বিপুল সম্ভাবনা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সহজ নৌ যোগাযোগ এবং
অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থান—সব মিলিয়ে ভোলা
গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়নের জন্য দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় জেলা। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, এই প্রাকৃতিক সম্পদ
শুধু উত্তোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে শিল্প,
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে
ভোলার প্রায় ২০ লাখ মানুষের
জীবনমান পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে। এখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অপেক্ষায় পুরো দ্বীপজেলা।
মন্তব্য করুন