ভারতের নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানানোর পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি আদৌ দেশে ফিরতে পারবেন কি না, ফিরলে কীভাবে ফিরবেন এবং দেশে পা রাখার পর তার কী হবে, এমনসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর গত দুই বছরে একাধিকবার দেশে ফেরার কথা বলেছেন শেখ হাসিনা। তবে এবারই প্রথম কোনো সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তিনি।
তবে শেখ হাসিনা চাইলেই কি দেশে ফিরতে পারবেন? আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজে থেকে দেশে ফিরতে তার ওপর সরাসরি কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু দেশে ফিরলেই তাকে একাধিক আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।
এর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত তাকে বাংলাদেশে ফিরতে দেবে কি না।
প্রত্যর্পণ চুক্তিই বড় বিষয়
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সাল থেকে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। ২০১৬ সালে চুক্তিটি সংশোধন করে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে গেলে তাকে গ্রেপ্তার করে আগের দেশে ফেরত পাঠাতে দুই দেশ একে অপরকে সহযোগিতা করবে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে হত্যা, গণহত্যা, গুম ও নির্যাতনের একাধিক মামলা রয়েছে। ফলে তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোকে কেবল রাজনৈতিক মামলা হিসেবে দেখিয়ে প্রত্যর্পণ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কতটা থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
চুক্তিতে রাজনৈতিক প্রকৃতির অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। তবে হত্যা, গুম, সন্ত্রাসবাদ, বোমা বিস্ফোরণসহ বেশ কিছু গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার কথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
২০১৬ সালে চুক্তি সংশোধনের পর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি আরও সহজ হয়। কোনো আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে সেটির কপি পাঠিয়েই অন্য দেশের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো সম্ভব।
এমনকি কোনো ব্যক্তি পালিয়ে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা থাকলে তাকে ৬০ দিনের জন্য অস্থায়ীভাবে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে ভারত চাইলে কী প্রত্যর্পণ আটকে দিতে পারে?
প্রত্যর্পণ চুক্তিতে এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যার ভিত্তিতে ভারত বাংলাদেশের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
চুক্তি অনুযায়ী, অভিযোগগুলো যদি ন্যায়বিচারের স্বার্থে সরল বিশ্বাসে আনা হয়নি বলে ভারতের মনে হয়, তাহলে প্রত্যর্পণের আবেদন নাকচ করার সুযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ফেরানোর ক্ষেত্রে এই বিধানটিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।
অর্থাৎ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোকে ভারত কীভাবে মূল্যায়ন করছে এবং প্রত্যর্পণ চুক্তির কোন বিধান প্রয়োগ করছে, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি।
দেশে ফিরলে কী হবে?
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে শুধু মামলা নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি রায়ও রয়েছে।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে আরও অসংখ্য মামলা রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘একজন ফিউজিটিভের পক্ষে কোনো আইনগত সুবিধা পাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। তাকে অবশ্যই আসতে হবে, এই ট্রাইব্যুনালেই সারেন্ডার করতে হবে। এই ট্রাইব্যুনালে সারেন্ডার করেই তাকে জেলে যেতে হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহসানুল করিমও বলেছেন, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় বিমানবন্দর থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
তবে শেখ হাসিনার বৈধ পাসপোর্ট না থাকায় দেশে ফিরতে হলে ট্রাভেল পাসের প্রয়োজন হতে পারে। সরকার তাকে সেই অনুমতি দেবে কি না, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তাহলে সিদ্ধান্ত কার হাতে?
রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু আইনি প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাবও জড়িত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সামিয়া জামান মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি পুরোপুরি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
তিনি বলেন, ‘উনি কী একা একাই আসলে এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কিনা? যে দেশে উনি আছেন, সেই দেশের কোনো রকম সংকেত ছাড়া এ ধরনের কথা বলতে পারেন কিনা, সেটাও দেখার বিষয়।’
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, দেশে ফেরার ঘোষণা রাজনৈতিক কৌশলের অংশও হতে পারে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলটির নেতা-কর্মীরা নানা চাপের মধ্যে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বার্তা তাদের মনোবল চাঙা রাখার একটি কৌশল হতে পারে।
ফলে শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চান—এটি এক বিষয়। কিন্তু তিনি চাইলেই দেশে ফিরতে পারবেন কি না, সেটি নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভারতের অবস্থান, বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং দেশে ফেরার পর তাঁকে মোকাবিলা করতে হবে এমন আইনি প্রক্রিয়া।
সূত্র: বিবিসি
মন্তব্য করুন