আজকের Channel Bhola সংবাদ
Channelbhola
প্রকাশ : Aug 22, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ভোলার গ্যাসে ১০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র: জরুরি সমাধান, নাকি নতুন কুইক রেন্টাল?



নিজস্ব প্রতিবেদক, ভোলা: ভোলার অব্যবহৃত গ্যাস কাজে লাগাতে ২২৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা এগোচ্ছে। এর মধ্যেই একই গ্যাস ব্যবহার করে তিন বছরের জন্য ১০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার এ উদ্যোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—স্বল্পমেয়াদি এই কেন্দ্র কি জরুরি সমাধান, নাকি অতীতের বিতর্কিত কুইক রেন্টাল ব্যবস্থার নতুন সংস্করণ?

সরকারের নির্দেশে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সম্প্রতি ১০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটির জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ৪ অক্টোবর। প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রটির চুক্তির মেয়াদ তিন বছর। প্রয়োজনে তা আরও এক বছর বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।

দ্রুত স্থাপনের লক্ষ্য

পিডিবি জানিয়েছে, কেন্দ্রটি হবে স্কিড-মাউন্টেড মডুলার প্রযুক্তির। কারখানায় টারবাইন, জেনারেটরসহ অন্যান্য সরঞ্জাম আগে থেকেই একত্রিত ও পরীক্ষা করে মডিউল আকারে সরবরাহ করা হবে। ফলে প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় এটি দ্রুত স্থাপন করা সম্ভব হবে।

পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ভোলায় প্রস্তাবিত ২২৫ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি নির্মাণে তিন থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে। এই সময় পর্যন্ত ভোলার অব্যবহৃত গ্যাস কাজে লাগাতেই স্বল্পমেয়াদি কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তাঁর দাবি, এটি আগের কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর মতো হবে না। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে।

পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, দরপত্র ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ছয় থেকে সাত মাস এবং কেন্দ্র নির্মাণে আরও অন্তত ছয় মাস সময় লাগতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রায় দেড় বছর পর কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন

তবে কেন্দ্রটির মেয়াদ ও আকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিমের মতে, তিন বছরের মধ্যে বিনিয়োগ তুলে নিয়ে মুনাফা করতে হলে উদ্যোক্তাকে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ বিক্রির প্রস্তাব দিতে হতে পারে।

তিনি বলেন, ভোলায় সম্ভাব্য এক থেকে দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এ গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে নেওয়া অথবা সেখানে বড় ও দক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদি কেন্দ্রের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কুইক রেন্টালের পুরোনো অভিজ্ঞতা

এখানেই সামনে আসছে কুইক রেন্টাল ব্যবস্থার পুরোনো অভিজ্ঞতা।

আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার যুক্তিতে একের পর এক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এসব কেন্দ্রের অনেকগুলোর চুক্তির মেয়াদ পরবর্তী সময়ে কয়েক দফা বাড়ানো হয়। উৎপাদন না করলেও চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার কারণে সরকারের ব্যয় বেড়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক অবস্থার পাশাপাশি বিদ্যুতের মূল্য ও সরকারি ভর্তুকিতেও।

ঘোড়াশালের ১৪৫ মেগাওয়াটের একটি কুইক রেন্টাল কেন্দ্র এ ক্ষেত্রে বহুল আলোচিত উদাহরণ। এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল প্রায় ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগে কেন্দ্রটি নির্মাণ করেছিল। তিন বছরের চুক্তি পরে বাড়িয়ে সাত বছর করা হয়। ওই সময়ে জ্বালানি ব্যয় বাদে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ২১ কোটি ১৪ লাখ ১০ হাজার ডলার পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্যাপাসিটি চার্জে থাকছে পার্থক্য

ভোলার বর্তমান উদ্যোগে অবশ্য বড় ধরনের পার্থক্যের কথা বলছে পিডিবি। কর্মকর্তাদের দাবি, কেন্দ্রটি আইপিপি বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার মডেলে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ যতটুকু বিদ্যুৎ নেওয়া হবে, শুধু ততটুকুর দাম পরিশোধ করা হবে। উৎপাদন না করলে অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। নির্ধারিত উৎপাদন করতে ব্যর্থ হলে উদ্যোক্তার ওপর জরিমানার ব্যবস্থাও থাকবে।

তবে খাতসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, তিন বছরের মতো স্বল্প মেয়াদে বিনিয়োগকারী কীভাবে প্রকল্পের ব্যয় ও মুনাফা সমন্বয় করবেন? তাঁদের আশঙ্কা, স্বল্প সময়ে বিনিয়োগ ফেরত নেওয়ার চাপ বিদ্যুতের দর বাড়িয়ে দিতে পারে।

কম দক্ষতার প্রযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কেন্দ্রটির প্রযুক্তি। প্রস্তাবিত ১০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি সিম্পল সাইকেল হওয়ায় এর জ্বালানি দক্ষতা তুলনামূলক কম। একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে কম্বাইন্ড সাইকেল কেন্দ্রের তুলনায় এতে বেশি গ্যাস প্রয়োজন হতে পারে।

অথচ ভোলায় প্রস্তাবিত পিডিবির ২২৫ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি কম্বাইন্ড সাইকেল প্রযুক্তির হওয়ার কথা। ফলে একই গ্যাস ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদি ও বেশি দক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ কতটা কাজে লাগানো হবে, সেই প্রশ্নও রয়েছে।

ভোলার গ্যাসের বড় অংশই অব্যবহৃত

ভোলায় গ্যাসের অপচয় ও ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।

বোরহানউদ্দিনে ১৯৯৫ সালে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাপেক্স। ২০০৯ সালে সেখানে উৎপাদন শুরু হয়। পরে ২০১৮ সালে ভোলা নর্থ এবং ২০২৩ সালে ইলিশা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। শাহবাজপুরে দৈনিক প্রায় ১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও ব্যবহার হচ্ছে সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ কোটি ঘনফুট।

ভোলায় প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও জাতীয় গ্রিডে তা নেওয়ার মতো পাইপলাইন নেই। দ্বীপজেলা হওয়ায় ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে নেওয়াও বড় অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ।

২০২৩ সালে ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থায় গ্যাস নেওয়ার জন্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৫ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি।

এর মধ্যে ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে শিল্পকারখানায় সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিমাণ সীমিত এবং ব্যয় তুলনামূলক বেশি। ফলে দেশের অন্য এলাকায় গ্যাস সংকট থাকলেও ভোলার একটি অংশের গ্যাস এখনও অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

এগোচ্ছে ২২৫ মেগাওয়াটের কেন্দ্র

এই বাস্তবতায় ভোলায় দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগও এগোচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিলেও শেষ পর্যন্ত পিডিবিকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ জন্য অর্থায়ন অনুসন্ধান ও প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) অনুমোদনের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে দেশের অন্য এলাকায় নেওয়ার পরিবর্তে সেখানেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুক্তিও রয়েছে। পিডিবির কর্মকর্তাদের হিসাবে, এক ঘনমিটার গ্যাস দিয়ে প্রায় চার থেকে পাঁচ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিদ্যমান সঞ্চালন ব্যবস্থার মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে পাঠানো সম্ভব হওয়ায় গ্যাস পরিবহনের তুলনায় এটি অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে।

মূল প্রশ্ন খরচ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে

ভোলার ১০০ মেগাওয়াটের স্বল্পমেয়াদি কেন্দ্র নিয়ে বিতর্কের মূল জায়গাটি হলো—অব্যবহৃত গ্যাস দ্রুত কাজে লাগানোর প্রয়োজন মেটাতে এমন একটি কেন্দ্র কতটা ব্যয়সাশ্রয়ী হবে এবং তিন বছর পর এর ভবিষ্যৎ কী হবে?

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের মতে, অতীতের উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি না করে সরকারকে আগে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। তাঁর বক্তব্য, বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত সংকট কেবল নতুন কেন্দ্র নির্মাণ করে সমাধান করা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে পিডিবির অবস্থান হলো, জরুরি বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বল্পমেয়াদি মডুলার বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করা হয়। কেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ হলে প্রয়োজন না থাকলে তা খুলে নেওয়া সম্ভব হবে।

শেষ পর্যন্ত ভোলার এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—দরপত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং চুক্তিতে এমন শর্ত রাখা, যাতে অতীতের মতো অপ্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটি চার্জ বা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি না হয়।

ভোলার গ্যাস দেশের বিদ্যুৎ সংকট কমাতে কাজে লাগলে তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে সেই গ্যাস ব্যবহারের নামে নতুন কোনো ব্যয়বহুল বিদ্যুৎচুক্তি যেন ভবিষ্যতের আরেকটি আর্থিক বোঝায় পরিণত না হয়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

তিস্তার পানি কমলেও কচুরিপানায় ভরে গেছে ফসলি জমি

1

বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা, পরীক্ষার্থীদের জন্য

2

হঠাৎ বেড়েছে বিদ্যুৎ বিল, যেভাবে অভিযোগ করবেন

3

২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ

4

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ভোলা জেলা আইনজীবী সমিতির সৌজন্য

5

সরকার প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে ধাপে ধাপে এ

6

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে বোরহানউদ্দিনে ছাত্রশিবিরের বিক্

7

জলবায়ু-সহনশীল নগর উন্নয়নে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করল বাংলাদেশ

8

ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার থেকে পদত্যাগের কারণ জানালেন জুমা

9

গণপিটুনিতে নিহত ঘাতকের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর

10

গুরুত্বপূর্ণ চার মন্ত্রীর পরিবর্তন চান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

11

লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নয়, তবুও ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্র

12

১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে হার মানলেন মোটরসাইকেলচালক রাফি

13

তিন দশকেও বদলায়নি ভোলার ভাগ্য, প্রধানমন্ত্রীর শিল্পপার্ক ঘোষ

14

প্রাথমিকের বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা মাসে যত টাকা করে পাবে

15

বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গার্ড অব অনা

16

জুলাই আন্দোলনে আহত, মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন রায়হান আলী

17

বিমানবন্দরে যেভাবে গ্রেপ্তার হলেন খলনায়ক ডন

18

চট্টগ্রামে বকেয়া বেতনের দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ

19

বঙ্গভবন থেকে বিদায় নিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

20