মো. মেহেদী হাসান, মনপুরা: সাগরবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা ভোলার মনপুরায় দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মোট ৪৮টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও একজন শিক্ষককে একসঙ্গে একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, আবার কোথাও গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ের পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, মনপুরা উপজেলায় মোট ৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৪৩টি হলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৫ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ১৮টি প্রধান শিক্ষকের পদ। এছাড়া সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ২১৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৮৯ জন। ফলে শূন্য রয়েছে আরও ৩০টি পদ। সব মিলিয়ে উপজেলায় বর্তমানে ৪৮টি শিক্ষক পদ খালি রয়েছে।
সরেজমিনে কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় নির্ধারিত শ্রেণি রুটিন অনুযায়ী পাঠদান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে একই সময়ে একাধিক শ্রেণিতে পাঠদান করতে হচ্ছে। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাবে বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
একাধিক অভিভাবক জানান, সন্তানরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে গেলেও শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক সময় সব ক্লাস অনুষ্ঠিত হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার সন্তানদের প্রাইভেট বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রধান শিক্ষক বলেন, অনুমোদিত পদের তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা অনেক কম। সীমিত জনবল দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে বিদ্যালয়গুলোকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে শিক্ষার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মনপুরার ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, নৌ-যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং দুর্গম পরিবেশের কারণে অনেক শিক্ষক এখানে যোগদান বা দীর্ঘদিন কর্মরত থাকতে আগ্রহী হন না। ফলে বদলি, পদোন্নতি কিংবা অবসরের পর দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্যই থেকে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আসরাফ বলেন, “উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো বেশ কিছু শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। তবে আশা করছি, আগামী ১ অক্টোবর থেকে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কিছু শিক্ষক যোগদান করবেন। এরপরও কয়েকটি পদ শূন্য থেকে যাবে। সেই পদগুলোতেও দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।”
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের ভিত্তি। তাই দীর্ঘদিন শিক্ষক সংকট অব্যাহত থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীদের ওপরই নয়, ভবিষ্যতের মানবসম্পদ উন্নয়নেও পড়বে।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের দাবি, মনপুরার মতো দুর্গম দ্বীপাঞ্চলের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা পদগুলো দ্রুত পূরণ করে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
মন্তব্য করুন