নিজস্ব প্রতিবেদক, মনপুরা (ভোলা):
মেঘনার বুকে মাছ ধরেই যাদের সংসার চলে, সেই জেলেদের জীবনে যেন একের পর এক সংকট নেমে আসছে। সামনে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে কয়েকটি দিন নদীতে মাছ শিকার করে পরিবারের ভরণপোষণের অর্থ জোগাড়ের আশায় ছিলেন মনপুরার জেলেরা। কিন্তু সেই আশাতেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপ।
নিষেধাজ্ঞা ও বৈরী আবহাওয়ার দ্বিমুখী চাপ
আগামী ৮ অক্টোবর থেকে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে শেষ সময়ে নদীতে মাছ শিকারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মনপুরার বহু জেলে। তাদের আশা ছিল, নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন মাছ ধরতে না পারায় যে আয়-রোজগারের ঘাটতি তৈরি হবে, তার কিছুটা আগে মাছ ধরে পুষিয়ে নেবেন।
তবে এরই মধ্যে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে বৈরী আবহাওয়া দেখা দেওয়ায় নদী ও সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া নিয়ে জেলেদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আবহাওয়ার পরিস্থিতি ও সতর্ক সংকেত
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থান করছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ৬টায় গভীর নিম্নচাপটি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৯০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। এটি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে রাতে ভারতের উত্তর অন্ধ্র প্রদেশ ও দক্ষিণ ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
এর প্রভাবে সমুদ্রবন্দর, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। নিম্নচাপ কেন্দ্রের ৪৮ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার, যা দমকা বা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
সংকটে জেলেরা, বাড়ছে ধারদেনা
স্থানীয় জেলেরা বলছেন, বছরের একটি বড় সময় নদী ও সাগরে মাছ ধরেই তাদের সংসার চলে। মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা, বৈরী আবহাওয়া এবং নদীতে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ার কারণে তাদের প্রায়ই ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। নিষেধাজ্ঞার আগে মাছ ধরার সুযোগটুকুও যদি আবহাওয়ার কারণে নষ্ট হয়, তবে পরিবারের খাবার, নৌকার জ্বালানি, জাল মেরামত ও অন্যান্য খরচ জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সব মিলিয়ে তাদের জীবনে এটি ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’।
প্রশাসনের নির্দেশনা ও জেলেদের দাবি
আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জেলেদের জোরালো দাবি, বৈরী আবহাওয়ার কারণে তারা মাছ ধরতে না পারলে নিষেধাজ্ঞার এই সময় ও পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য যেন দ্রুত কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা হয়।
মন্তব্য করুন