হাসান ফরাজি, বোরহানউদ্দিন; বুধবার ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞার কবলে বোরহানউদ্দিনের ২০ হাজার জেলে। এ সময় ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে উপজেলার প্রায় ২০ হাজার জেলে পরিবারের জীবিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে কমে এসেছে মাছ ধরার ব্যস্ততা। একে একে ঘাটে ফিরছে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার। কেউ জাল গুটিয়ে রাখছেন, কেউ ছেঁড়া জাল মেরামত করছেন। আবার কেউ শেষবারের মতো নদীতে মাছ ধরে ঘাটে ফিরছেন।
সরেজমিনে বোরহানউদ্দিন উপজেলার হাকিমউদ্দিন, হাসাননগর, মির্জাকালু ও সাচড়াসহ বিভিন্ন মাছঘাট ঘুরে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই অধিকাংশ জেলে নদী থেকে ঘাটে ফিরছেন। সারিবদ্ধভাবে রাখা হচ্ছে নৌকা ও ট্রলার। ঘাটজুড়ে চলছে জাল গুছিয়ে নেওয়া ও নৌযান নিরাপদে রাখার প্রস্তুতি।
২২ দিন কর্মহীন, সংসার চলবে কীভাবে
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বোরহানউদ্দিন উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৯ হাজার ৮৩৮ জন। এর মধ্যে এবারের নিষেধাজ্ঞায় ১৭ হাজার ২০০ জেলের জন্য মাথাপিছু ২৫ কেজি করে মোট ৪৩০ মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তবে জেলেরা বলছেন, ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় শুধু সরকারি চাল দিয়ে সংসারের সব খরচ চালানো কঠিন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি নৌকা ও জাল মেরামতের খরচ, ধারদেনা এবং এনজিওর ঋণের কিস্তি রয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময়টিকে তারা আয়-রোজগার বন্ধ থাকার কঠিন সময় হিসেবে দেখছেন।
মির্জাকালু ঘাটে ট্রলার বাঁধছিলেন প্রবীণ জেলে রহিম মাঝি। তিনি বলেন, “সরকারের আইন তো মানতেই হইবো, তাই ডাঙ্গায় উইঠা আইছি। কিন্তু এই ২২ দিন পোলাপান লইয়া খামু কী? সরকার যে ২৫ কেজি চাল দেয়, তা দিয়া কি পুরা মাস চলে? এর মধ্যে আবার এনজিওর কিস্তির চাপ। ধারদেনা কইরা কোনোমতে সংসার চালাইতে হইবো।”
হাকিমউদ্দিন ঘাটের জেলে সাত্তার হাওলাদার বলেন, “নদীতে না গেলে আমাগো ইনকাম জিরো। অবরোধের সময় সরকার যে চাল দেয়, তা হাতে পাইতে পাইতে অবরোধ অর্ধেক শ্যাষ হইয়া যায়। অনেক সময় আসল জেলেরা ঠিকমতো পায়ও না। অবরোধ শুরুর লগেলগেই চালটা হাতে দেওয়া হোক। এই সময় অন্তত এনজিওর কিস্তি নেওয়া বন্ধ থাকুক।”
সাচড়া ঘাটে ছেঁড়া জাল মেরামত করছিলেন তরুণ জেলে জামাল। তিনি বলেন, “পেট তো আর অবরোধ বোঝে না। পরিবারের মুখের দিকে তাকাইয়া এই ২২ দিন আমাগো কাছে ২২ বছরের সমান মনে হয়।”
কঠোর নজরদারির দাবি
মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নদীতে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, মাছঘাট ও নৌযান চলাচলের এলাকাগুলোতে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জোরদার করতে হবে।
তারা আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞা সফল করতে প্রকৃত জেলেদের সরকারি সহায়তা দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ যাতে নদীতে মাছ শিকার করতে না পারে, সে বিষয়েও প্রশাসনকে কঠোর থাকতে হবে।
বোরহানউদ্দিন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনোজ কুমার শাহা বলেন, “মা ইলিশ রক্ষায় আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছি। আজ মধ্যরাত থেকেই নদীতে নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে কঠোর নজরদারি শুরু হবে। আইন অমান্য করলে জেল-জরিমানাসহ জাল ও ট্রলার বাজেয়াপ্ত করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “জেলেদের কষ্ট লাঘবে ১৭ হাজার ২০০ নিবন্ধিত জেলের জন্য বরাদ্দ করা ৪৩০ টন চাল দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বিতরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং উপকূলীয় এলাকার মানুষের অন্যতম প্রধান জীবিকার উৎস। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়তে পারে।
তবে জেলেদের প্রত্যাশা, ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি কর্মহীন এ সময়ে সরকারি সহায়তাও দ্রুত তাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে। নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও যেন জেলেদের ঘরের চুলা বন্ধ না হয়—এটাই এখন তাদের প্রধান দাবি।
মন্তব্য করুন