চ্যানেল ভোলা: বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১২০টি সেপটিক ট্যাংক দুর্ঘটনা ঘটে। আধুনিক ভবনের একটি অপরিহার্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও সেপটিক ট্যাংকের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করায় এগুলো অনেক সময় প্রাণঘাতী মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে না। ফলে মলমূত্র ও অন্যান্য বর্জ্য পচে অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্যে নেমে আসে এবং তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত গ্যাস। এসব গ্যাসের প্রভাবে মুহূর্তের মধ্যেই মানুষ অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।
বিষাক্ত গ্যাসই প্রধান ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা জানান, সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে হাইড্রোজেন সালফাইড, মিথেন, অ্যামোনিয়া ও কার্বন মনোক্সাইড।
হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস পচা ডিমের মতো দুর্গন্ধযুক্ত এবং এটি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে দ্রুত অকার্যকর করে দিতে পারে। অন্যদিকে মিথেন ও অ্যামোনিয়া ট্যাংকের ভেতর থেকে অক্সিজেন সরিয়ে দেয়। কার্বন মনোক্সাইড শরীরে অক্সিজেন পরিবহন বাধাগ্রস্ত করে দ্রুত অজ্ঞান করে ফেলতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ট্যাংকের ভেতরে নেমে একজন অচেতন হয়ে পড়লে তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে আরও কয়েকজন একই দুর্ঘটনার শিকার হন।
অসচেতনতাই বাড়াচ্ছে প্রাণহানি
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই সেপটিক ট্যাংকে নামা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না করা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার না করাই অধিকাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ রসায়ন সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন ইতোমধ্যে হাতে-কলমে বা ম্যানুয়ালি সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছে। তারা আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
দুর্ঘটনা এড়াতে করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার বা মেরামতের আগে অন্তত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা ঢাকনা খুলে রাখতে হবে, যাতে ভেতরের বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে যেতে পারে।
ট্যাংকে প্রবেশের আগে অক্সিজেনের উপস্থিতি পরীক্ষা করা জরুরি। পাশাপাশি অক্সিজেন মাস্ক, সেফটি বেল্টসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে।
কোনো ব্যক্তি বা প্রাণী ট্যাংকের ভেতরে পড়ে গেলে নিজে উদ্ধার করতে না নেমে দ্রুত ফায়ার সার্ভিস বা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীদের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সচেতনতাই হতে পারে সমাধান
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপটিক ট্যাংক দুর্ঘটনার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য। নির্মাণকাজের সময় নিরাপদ নকশা অনুসরণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
তাদের মতে, সেপটিক ট্যাংকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু ভবন মালিকের নয়, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। সচেতনতা ও সতর্কতাই পারে এ নীরব মৃত্যুফাঁদ থেকে অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করতে।