সামান্য জ্বর ও পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল সাড়ে চার বছরের শিশু আভানকে। সুস্থ অবস্থায় হেঁটে হাসপাতালে আসা শিশুটির চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে।
এরপরই হাসপাতালের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তার বাবা, গণমাধ্যমকর্মী মৃদুল ইসলাম।
মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সন্তানের মৃত্যুর পর কান্নায় ভেঙে পড়ে মৃদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ছেলেটারে ওরা মাইরা ফেললো ভাই! আমার ছেলেটারে মাইরা ফেললো! আমার বাচ্চা... একদম সুস্থ বাচ্চা হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে আসছে। আমার বাচ্চা ফেরত দেন, আর কিছু লাগবে না।’
আভানকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর কয়েক দিন সেখানেই চিকিৎসা চলছিল। সন্তানের মৃত্যুর পর হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মৃদুল।
নিজের সন্তানের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘শোনেন, বিশ্বাস করেন, আমি চাকরি করি না। ছেলেটারে স্কুলে দিবো বলে আমি ছোট ছোট কাজ করি। আমি আমার ওয়াইফের সাথে প্ল্যান করছি, আমি আর বাচ্চা নেব না। তা না হলে আভানের প্রতি ভালোবাসা কমে যাবে। আমি আভানকে কারও সাথে শেয়ার করি না। ওকে কারো কাছে দেই না। ওকে আমি বাইকে নিয়ে ঘুরি। ও একটা লাল গাড়ি কিনবে, তাই আমি গাড়ির জন্য টাকা জমাচ্ছি।’
ছেলের চিকিৎসার শেষ সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। মৃদুল ইসলাম বলেন, ‘ভাই! আমার ছেলেটারে ওরা মাইরা ফেললো ভাই! ও আর নেই ভাই! আমি বিশ্বাস করতে পারছি না! ও ভাই, আমাকে... আমাকে মাইর্যাই ফেলেন ভাই! আমার ছেলে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে।
ওরা ভুল চিকিৎসা না দিলে ভাই, আমাকে কিছু একটা জানাতো না? তিন দিন ধরে ওয়ার্ডে ও খাচ্ছে। বাসা থেকে চিকেন নিয়ে আসা হয়েছে, সেমাই নিয়ে আসা হয়েছে। আমাদের কাছে ভিডিও আছে। ও খাচ্ছিল আর বলছিল, ‘পাপা, তুমি চলে আসো’। আমি ইমার্জেন্সি টিকিট কেটেছি, আমি আর এখানে থাকবো না। ওরা ভাই ক্যানুলা পর্যন্ত করতে পারে না!’
হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি এদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভালো বলে প্রমাণ করতে পারে, আমি এখানে নাকে খত দিয়ে চলে যাব ভাই! এদের সেবা নিয়ে কেউ কি একটা ভালো কথা বলতে পারবে?’
মৃদুল ইসলামের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসা, অবহেলা এবং অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে আভানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়।
একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা তাকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে সে সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেডিকেল পেপার্স ও প্রয়োজনীয় লিখিত তথ্য দিতে গড়িমসি করায় কয়েক ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পাশাপাশি রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার না করা এবং অবস্থার অবনতির সময় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ারও অভিযোগ করেন শিশুটির বাবা।
তবে পরিবারের এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক ডা. এ কে মাহবুবুল হক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘এক কথায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যখন যা করা দরকার, করা হয়েছে। বিন্দু পরিমাণ কোথাও ব্যত্যয় হয়নি। বাচ্চা মারা গেছে, সেটাতে আমাদেরও কষ্ট লাগছে। তার তো একটাই মাত্র সন্তান, তার কষ্টটা অবর্ণনীয়। কিন্তু চিকিৎসায় কোথাও আমরা গ্যাপ রাখিনি। একেবারে পই পই করে সবকিছু দেখা হয়েছে। সবকিছু ঠিকই ছিল। বাচ্চাগুলো এ রকমই মারা যায়- তিন-চার দিন পরে হঠাৎ করে প্রেশার আর ওঠে না, তখন আর কিছু করার থাকে না। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।’
চিকিৎসায় কোনো ধরনের গাফিলতি বা ভুল হয়নি দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘কোথাও কোনো ফল্ট হয়নি- চিকিৎসায়, ওষুধপত্রে কিংবা কেয়ারে। এটা তো আমাদের পরিচিত রোগী ছিল, আমাদের এমডি স্যারের পরিচিত। যার কারণে আমরা ওনাদের আরও বেশি কেয়ার করার চেষ্টা করেছিলাম।
কিন্তু আল্টিমেটলি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেছে। ওনাদের ধারণা ভুল চিকিৎসা হয়েছে, কিন্তু এটা সঠিক নয়। আমাদের সব ডকুমেন্ট আছে। আপনারাও যদি দেখতে চান, আমরা সব ডকুমেন্ট দেব। আমরা আমাদের একটি প্রতিবেদনও তৈরি করে রেখেছি।
পাশাপাশি আমাদের চেয়ারম্যান ম্যাডাম পাঁচ সদস্যের একটি বোর্ডও করে দিয়েছেন। তারা বিষয়টি আরও যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দেবেন। তবে আমরা ইনশাআল্লাহ কনফার্ম যে, এখানে আসলে কোনো ভুল চিকিৎসা হয়নি; চিকিৎসকরা বাঁচানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা সম্ভব হয়নি।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, চিকিৎসা, ওষুধ কিংবা রোগীর যত্ন- কোনো ক্ষেত্রেই গাফিলতি ছিল না। বিষয়টি নিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি বোর্ডও গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক।
অন্যদিকে, শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলা ও সময়ক্ষেপণের কারণেই আভানের মৃত্যু হয়েছে। ফলে শিশুটির মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের অভিযোগ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দাবি।
মন্তব্য করুন