
মো. হাসান ফরাজী, বোরহানউদ্দিন প্রতিনিধি: ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নের মলাইপত্তন এলাকা থেকে কাচিয়া ইউনিয়নের চকডোষ পর্যন্ত বিস্তৃত ঐতিহ্যবাহী জনতা খাল এখন অবহেলা, দখল ও দূষণের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খালটি পুনঃখনন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কচুগাছ ও ময়লায় ভরাট হয়ে পানি চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকটে পড়েছেন এলাকার হাজারো মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফকিরহাট থেকে লেবুকাটা পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ জনতা খাল একসময় কৃষি, সেচ, মৎস্যসম্পদ এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে কুঞ্জেরহাট বাজারের বর্জ্য খালে ফেলা এবং নিয়মিত খননের অভাবে বর্তমানে খালটি কার্যত একটি বিশাল ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের বিভিন্ন অংশে বর্জ্যের স্তূপ জমে পানি প্রবাহ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে পুরো খালজুড়ে কচুগাছ ছড়িয়ে পড়ায় একসময়ের সচল জলপথ এখন দুর্গন্ধযুক্ত জলাশয়ে রূপ নিয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, জনতা খাল দিয়ে ফকিরহাট, কুঞ্জেরহাট, মলাইপত্তন, চকডোষসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার বৃষ্টির পানি সহজেই নিষ্কাশন হতো। কিন্তু বর্তমানে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ থাকায় বর্ষায় বৃষ্টির পানি বের হতে না পেরে বিভিন্ন গ্রামে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও কৃষিজমি দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে খালে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কৃষকরা সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছেন না। ফলে সময়মতো জমিতে সেচ দিতে না পারায় ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় জলাবদ্ধতায় আমনসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল নষ্ট হচ্ছে। এতে কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আগে জনতা খালের পানি দিয়ে সহজেই জমিতে সেচ দেওয়া যেত। এখন খালটি কচুগাছ ও ময়লায় ভরে যাওয়ায় শুকনো মৌসুমে পানি পাওয়া যায় না। বর্ষাকালে আবার পানি নামতে না পারায় জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়।
আরেক বাসিন্দা বলেন, দ্রুত খালটি খনন ও পরিষ্কার না করলে প্রতিবছর জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ আরও বাড়বে। দুর্গন্ধে পরিবেশও দূষিত হচ্ছে।
কুঞ্জেরহাট বাজারের ব্যবসায়ী মো. শাহিন বলেন, "বাজারে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে খালে ময়লা ফেলছেন। এতে পরিবেশ যেমন দূষিত হচ্ছে, তেমনি খালও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।"
এলাকাবাসীর দাবি, জনতা খালকে দখল ও দূষণমুক্ত করে দ্রুত পুনঃখনন, কচুগাছ অপসারণ এবং কুঞ্জেরহাট বাজারে আধুনিক ও স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে খালে কোনো ধরনের ময়লা-আবর্জনা ফেলা না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে জনতা খাল আবারও তার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে পাবে। এতে জলাবদ্ধতা কমবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে এবং টবগী ও কাচিয়া ইউনিয়নসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকাংশে লাঘব হবে।