
দেশের প্রতিটি উপজেলায় ১০ জন করে তরুণ উদ্যোক্তাকে চিহ্নিত করে তাদের ব্যবসার জন্য ঋণ ও শর্তসাপেক্ষ অনুদান দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেক উদ্যোক্তা ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন পাবেন।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
তিনি জানান, ‘উদ্যোগ’ কোনো প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক কর্মসূচি নয়। বরং তফসিলি ব্যাংকের শাখাগুলোর মাধ্যমে উপজেলা পর্যায় থেকে সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করা হবে। তাদের ব্যবসার পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা ও অর্থের প্রয়োজন যাচাই করে দেওয়া হবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন।
‘উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ নামের এ উদ্যোগে প্রাথমিকভাবে দেশের ৮ বিভাগের ৮ জেলায় কার্যক্রম শুরু করা হবে। সফলতা এলে পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলা ও উপজেলায় তা সম্প্রসারণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উদ্যোক্তাভেদে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করা হবে। এর মধ্যে থাকবে ঋণ ও শর্তসাপেক্ষ অনুদান। উদ্যোক্তার ব্যবসার ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট খাতের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া হবে। এ ঋণের সুদের হার হবে ৪ থেকে ৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, অনুদানের অর্থ আসবে ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে। উদ্যোক্তা অনুদানের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করলে ওই অর্থ ফেরত দিতে হবে না। তবে অর্থের সঠিক ব্যবহার না হলে অনুদানের অর্থ ঋণে রূপান্তর করা হবে।
কীভাবে বাছাই হবে উদ্যোক্তা
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের গত ৩০ আগস্টের সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, দেশের প্রত্যন্ত ও উপজেলা পর্যায়ে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণের ব্যবসায়িক ধারণা থাকলেও প্রাথমিক মূলধন, পরামর্শ, প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক ও অর্থায়নের অভাবে তারা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারেন না। এসব তরুণকে খুঁজে বের করে অর্থায়নের আওতায় আনতেই এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হবে। এরপর যাচাই-বাছাই ও সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরির মাধ্যমে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের নির্বাচন করা হবে। তাঁদের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, প্রকৃত অর্থের প্রয়োজন এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা মূল্যায়ন করে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
উদ্যোক্তা নির্বাচনের কাজে বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা অফিস, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি জেলায় একটি ব্যাংক এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করবে।
৫০০ কোটি টাকার তহবিল
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলায় মোট ৫০৩টি উপজেলা রয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় ১০ জন করে মোট ৫ হাজার ৩০ জন তরুণ উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ জন্য ৫০০ কোটি টাকার তহবিল অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে ২৫০ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাকি ২৫০ কোটি টাকা দেবে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো।
তহবিলের একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর সিএসআর কর্মসূচি থেকে দেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক খরচ মেটাতে শুরুতেই অনুদানের একটি অংশ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি অংশ আলাদা হিসাবে সংরক্ষিত থাকবে। উদ্যোক্তার ঋণ পরিশোধের আগ্রহ ও নির্দিষ্ট মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে ওই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে।
প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ
কর্মসূচির আওতায় শুধু অর্থায়ন নয়, উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা খুঁজে বের করা, প্রচার, আবেদন যাচাই, সভা-সেমিনার, ব্যবসায়িক ধারণা মূল্যায়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আলাদা ব্যয় ধরা হয়েছে।
এসব প্রশাসনিক ও বাস্তবায়ন ব্যয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএমএসএমই তহবিল থেকে বহন করা হবে।
উদ্যোক্তা অর্থায়নবিষয়ক পরামর্শক শওকত হোসেন বলেন, উদ্যোগটি ভালো হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে উদ্যোক্তা অর্থায়নের কিছু তহবিলের অভিজ্ঞতা ভালো না হওয়ায় এবার উদ্যোক্তা বাছাইয়ে পেশাদারত্ব ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে যোগ্য উদ্যোক্তা নির্বাচন করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, উদ্যোক্তা নির্বাচন পেশাদারভাবে করতে হবে। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর অর্থায়ন করা প্রয়োজন। অনুদানের অর্থও ধাপে ধাপে দেওয়া হলে এ উদ্যোগ থেকে বড় ধরনের ফলাফল পাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থায়নের সুযোগ ও বিকাশে কার্যকর সহায়তার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা অল্প সময়েই ঝরে পড়েন। নতুন এই কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁদের খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও সহায়তা দেওয়া গেলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।