
মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা এবং পাসপোর্ট করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন ১৭ বছর শাহেদ শরীফ আহমেদ। গড়ে তোলেন ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site)। এবার সেই ওয়েবসাইটে একের পর এক অভিযোগে নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
ময়মনসিংহের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে এক শিক্ষকের পরিবারের পাওনা টাকা ছাড় করতে ঘুষ দাবির অভিযোগে দুই কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে।
শোকজ পাওয়া দুজন হলেন- ময়মনসিংহ সদর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মুহাম্মদ মজিবুর রহমান। সোমবার (৩১ আগস্ট) সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন তাদের এ নোটিশ দেন।
নোটিশে তিন কার্যদিবসের মধ্যে ঘুষ দাবি ও হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
শাহেদের বাবা ও সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম শামীম জানান, ময়মনসিংহের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমিনা খাতুন ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মারা যান। তার মৃত্যুর পর জমাকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলতে গিয়ে বিভিন্ন দফতরে তাকে হয়রানির মুখে পড়তে হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা- মোট ৩৮ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন তিনি।
এরপর কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ টাকা এবং চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর সরকারি অনুদানের ৮ লাখ টাকা ছাড় করাতে আবারও ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
বিষয়টি শাহেদকে ভাবিয়ে তোলে। নিজের কোডিং দক্ষতা ব্যবহার করে বন্ধু সাইফ কবিরকে সাথে নিয়ে গত ২১ আগস্ট চালু করেন ‘ঘুষ.সাইট’।
ওয়েবসাইটটির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ঘুষ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ জমা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। চালুর মাত্র ৯ দিনের মধ্যে এতে জমা পড়ে ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ। এসব অভিযোগে দাবি করা ঘুষের আনুমানিক পরিমাণ ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
চার সদস্যের একটি দল অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করছে। তবে আইনি জটিলতা এড়াতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।
শাহেদ বলেন, তাদের উদ্দেশ্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত করা নয়। বরং দেশের বিভিন্ন দফতরে ঘুষ ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে সংশ্লিষ্টদের নজরে আনা।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান টিটু বলেন, ঘুষের কারণে নাগরিক সেবা বাধাগ্রস্ত হয়। প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব অভিযোগের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ দুর্নীতি প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, তরুণদের এ উদ্যোগ পুলিশের নজরে এসেছে। কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক রাজু মো. সারওয়ার হোসেন বলেন, ঘুষ দাবির বিষয়ে ভুক্তভোগীরা দুদকে অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও অভিযান চালানো হতে পারে।
১৭ বছরের শাহেদের তৈরি প্ল্যাটফর্ম এখন শুধু একটি ওয়েবসাইট নয়, বরং সরকারি সেবায় ঘুষ ও অনিয়মের তথ্য সামনে আনার একটি নতুন উদ্যোগ হিসেবে আলোচনায় এসেছে।