
মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর বুকে প্রতিবছরই জেগে উঠছে নতুন নতুন চর। নদীবাহিত পলি জমে সৃষ্টি হওয়া এসব চর ভোলার আয়তন ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। তবে এর বিপরীতে নদীর ভয়াবহ ভাঙনে প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক ও বাজার। ফলে নতুন ভূমি সৃষ্টির পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো জনপদ, বদলে যাচ্ছে ভোলার মানচিত্র।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোলা সদর, দৌলতখান, তজুমদ্দিন, বোরহানউদ্দিন, চরফ্যাশন ও মনপুরার বিভিন্ন নদী এলাকায় গত কয়েক বছরে অসংখ্য নতুন চর জেগে উঠেছে। কোথাও কাশবন, কোথাও কৃষিজমি, আবার কোথাও গড়ে উঠছে নতুন বসতি। এসব চরে ধান, তরমুজ, চিনাবাদাম, মরিচ, মুগডালসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে একই সময়ে মেঘনার তীব্র ভাঙনে জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের শত শত পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। প্রতি বছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, কবরস্থান, গাছপালা ও কৃষিজমি। অনেক পরিবার একাধিকবার ভাঙনের শিকার হয়ে নতুন জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, কয়েক দশক আগের ভোলার মানচিত্রের সঙ্গে বর্তমান অবস্থানের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। কোথাও নদী গিলে খেয়েছে পুরোনো জনপদ, আবার কোথাও নদীর বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে নতুন চর। এর প্রভাব পড়ছে প্রশাসনিক সীমানা, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের জীবন-জীবিকায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই একই সঙ্গে চর জাগা ও নদীভাঙনের ঘটনা ঘটে। হিমালয় থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ পলি মোহনায় জমে নতুন ভূমি সৃষ্টি করে, আবার নদীর প্রবল স্রোত ও গতিপথ পরিবর্তনের কারণে অন্য অংশে দেখা দেয় ভয়াবহ ভাঙন।
পরিবেশবিদদের মতে, নতুন চর কৃষি, মৎস্য, পশুপালন ও পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি করলেও নদীভাঙন হাজারো মানুষের জন্য মানবিক সংকট সৃষ্টি করছে। তাই চর উন্নয়নের পাশাপাশি নদীভাঙন প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি, নতুন চরগুলো দ্রুত সরকারি জরিপের আওতায় এনে ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় টেকসই নদীশাসন, জিও ব্যাগ ও কংক্রিট ব্লক ফেলে তীর সংরক্ষণ, স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলার ভবিষ্যৎ শুধু নতুন চর জাগার ওপর নির্ভর করছে না; বরং নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একদিকে নতুন ভূমির জন্ম হলেও অন্যদিকে যদি পুরোনো জনপদ নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে থাকে, তবে টেকসই উন্নয়ন ও মানুষের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। নদীর সঙ্গে ভোলাবাসীর এই লড়াই বহু বছরের, আর সেই লড়াই এখনও চলমান।