
দেশের দুটি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তীব্র গ্যাস সংকটে পড়েছে আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন খাত। এ সংকট মোকাবিলায় ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে পাইপলাইন না থাকাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ২১ জুলাই থেকে সারা দেশে গ্যাসের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশ থেকে অতিরিক্ত গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোলার গ্যাস যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও সম্প্রতি জানিয়েছেন, ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস মূল ভূখণ্ডে এনে জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় বর্তমানে দুটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে ৯টি কূপ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও স্থানীয় চাহিদা ও পাইপলাইন সংকটের কারণে বর্তমানে মাত্র ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।
এছাড়া ভবিষ্যতে আরও ১৫টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে পেট্রোবাংলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের জন্য পাইপলাইন নির্মাণই দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান। বর্তমানে সিএনজি বা এলএনজি আকারে গ্যাস পরিবহন করা সম্ভব হলেও এতে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়, যা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাকে আবারও গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করে দ্রুত প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া উচিত। তিনি মনে করেন, বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির তুলনায় ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা কম ব্যয়বহুল হবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে শিল্প উদ্যোক্তারা এ দামের বিরোধিতা করে বলেন, বর্তমানে পাইপলাইনের গ্যাসের দাম প্রায় ৩০ টাকা, ফলে এত বেশি দামে গ্যাস কিনে শিল্প পরিচালনা করা কঠিন হবে।
বর্তমানে সিএনজি আকারে ভোলা থেকে সীমিত পরিসরে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪৭ টাকা ৬০ পয়সা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) মনে করে, ভোলা থেকে গ্যাস পরিবহনের পরিবর্তে সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা আরও সাশ্রয়ী হতে পারে। তাদের মতে, প্রতি ঘনমিটার গ্যাস দিয়ে ৪ থেকে ৫ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালনের খরচ গ্যাস পরিবহনের তুলনায় অনেক কম।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন নির্মাণ কারিগরিভাবে চ্যালেঞ্জিং হলেও এটি সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। ভবিষ্যতে ভোলার গ্যাস উৎপাদন ৩৫০ থেকে ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছালে পাইপলাইন নির্মাণ অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
এদিকে সরকার জানিয়েছে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় কাজ চলছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, "ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য যা যা করণীয়, সরকার তা করবে।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে চলমান গ্যাস সংকট নিরসন এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।