
ল্যাবরেটরি কিংবা সীমান্ত পেরিয়ে আসা চালান নয়; বরং রাজধানীর ঠিক পাশেই কেরানীগঞ্জের বসতবাড়িতে গড়ে তোলা হয় পুরোদস্তুর ইয়াবা তৈরির কারখানা।
এছাড়া, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া কেবল অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে নিজেই ‘কেমিস্ট’ সেজে কেমিক্যাল গুলে ইয়াবা বানাচ্ছিলেন নাছির। আর সেই বিষাক্ত ট্যাবলেট মোটরসাইকেলে চেপে পৌঁছে দেওয়া হতো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়।
রোববার (২ আগস্ট) রাতে র্যাব-২ এর পৃথক সাঁড়াশি অভিযানে কেরানীগঞ্জ ও মোহাম্মদপুর থেকে এই চক্রের গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।
অভিযানে ইয়াবা তৈরির ২টি মেশিন, ১৭ কেজি কাঁচামাল, ৩১ হাজার ২৭২ পিস ইয়াবা এবং ১টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
র্যাব সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কেরানীগঞ্জের মদিনা মার্কেট এলাকার একটি গোপন আস্তানায় অভিযান চালায় র্যাব-২ এর দল। সেখানে গিয়ে রীতিমতো তাজ্জব বনে যান আভিযানিক সদস্যরা। বসতবাড়ির ভেতরেই বসানো হয়েছিল ইয়াবা তৈরির আধুনিক মেশিন। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় ইয়াবা তৈরির মেশিনসহ ১৭ কেজি কেমিক্যাল কাঁচামাল ও ১৯ হাজার ৫২০ পিস ইয়াবা।
অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় কারখানার মালিক ও কথিত কেমিস্ট নাছিরকে (৪৫)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, নাছির একাই এই কারখানার চালিকাশক্তি। তিনি নিজেই কাঁচামাল সংগ্রহ করতেন, মিশ্রণ তৈরি করতেন এবং মেশিনের সাহায্যে চাপ দিয়ে ট্যাবলেটে রূপ দিতেন। কেমিস্টের পাশাপাশি নিজেই ‘ডিলার’ সেজে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই বিষাক্ত ট্যাবলেট বাজারজাত করতেন তিনি।
র্যাব-২ সূত্রে জানা যায়, উদ্ধার হওয়া এই ১৭ কেজি কেমিক্যাল দিয়ে আরও কয়েক লাখ পিস ইয়াবা তৈরি করা সম্ভব ছিল।
চক্রের অন্যতম ডিলার ফয়সাল ইসলাম মিঠু (৪২)। তিনি মূলত মোটরসাইকেলে করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ইয়াবার বড় চালান পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন। রোববার রাতে মোহাম্মদপুরের বসিলা হাউজিং এলাকা থেকে ১১ হাজার ৭৫৯ পিস ইয়াবাসহ তাকে হাতেনাতে আটক করে র্যাব।
পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই কেরানীগঞ্জে তার নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা তৈরির আরও ১টি মেশিনের সন্ধান পায় আভিযানিক দল।
সূত্রটি আরও জানায়, আটক মিঠুর বিরুদ্ধে ডিএমপির গুলশান, তেজগাঁও, ডেমরা ও মোহাম্মদপুর থানায় দাঙ্গা, চুরি, বলপূর্বক অর্থ গ্রহণ ও চোরাইমাল বিক্রির অন্তত ৪টি মামলা রয়েছে। কেরানীগঞ্জ ও মোহাম্মদপুর এলাকায় মাদকের সাম্রাজ্য ও আধিপত্য ধরে রাখতে কাজ করত স্থানীয় গ্যাংস্টাররা। একই রাতে মোহাম্মদপুরের বোটঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১টি লোডেড ‘ওয়ান শুটারগান’সহ আটক করা হয় কুখ্যাত সন্ত্রাসী মো. হাসান ওরফে ‘মাগুর হাসান’ (২৮)-কে।
র্যাব-২ এর অধিনায়ক অ্যাডিশনাল ডিআইজি নাজমুল হাসান জানান, মাগুর হাসান এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে চরম আতঙ্কের নাম। তার বিরুদ্ধে ভোলার লালমোহন ও রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় ডাকাতি, দস্যুতা, হত্যাচেষ্টা ও মাদকের প্রায় ৮টি মামলা রয়েছে এবং ২টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। এর আগে অন্তত ৫ বার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও তিনি একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
তিনি আরও জানিয়েছেন, বাসাবাড়িতে ইয়াবা তৈরির এই চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত এবং কেমিক্যালের কাঁচামালগুলো কোথা থেকে আসছিল, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চক্রের অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আটক আসামিদের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর ও কেরানীগঞ্জ থানায় মাদক ও অস্ত্র আইনে নতুন মামলা দায়েরের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে র্যাব।