
রোগবালাইমুক্ত ও উন্নতমানের চারা উৎপাদনে দেশে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে টিস্যু কালচার প্রযুক্তি। আধুনিক জৈবপ্রযুক্তিনির্ভর কাচঘেরা ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত এসব চারা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ফলন বৃদ্ধি এবং বিদেশি চারার ওপর নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন ‘টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় বর্তমানে মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে তিনটি আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে বান্দরবানের বালাঘাটা, সাভারের রাজালাখ, কুমিল্লা সদর, ভোলার চরফ্যাশন ও টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে আরও পাঁচটি ল্যাব নির্মাণাধীন রয়েছে।
সম্প্রতি মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টার পরিদর্শনে দেখা যায়, জীবাণুমুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ক্ষুদ্র উদ্ভিদ টিস্যু থেকে রোগমুক্ত চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্তমানে সেখানে জি-৯ কলা, এমডি-২ আনারস, স্ট্রবেরি, জারবেরা, অর্কিড, লিলিয়াম ও স্টেভিয়াসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফল, ফুল ও উদ্যান ফসলের চারা উৎপাদিত হচ্ছে।
ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহের তিনটি ল্যাবে মোট ২ লাখ ১২ হাজার ৩৮৭টি চারা উৎপাদন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৯২ হাজার ৬৩৭টি চারা কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে বিক্রি হয়েছে। চাহিদা বৃদ্ধির কারণে আগামী অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে।
মাদারীপুরের মোস্তফাপুর হর্টিকালচার সেন্টারের সহকারী টিস্যু কালচারিস্ট মোহাম্মদ এনামুল ইসলাম বলেন, ইন-ভিট্রো প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত চারা মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখে এবং রোগমুক্ত থাকে। একটি ক্ষুদ্র টিস্যু থেকেই ধাপে ধাপে হাজার হাজার চারা উৎপাদন সম্ভব হয়।
তিনি জানান, ল্যাবে উৎপাদিত চারাগুলো সরাসরি মাঠে দেওয়া হয় না। প্রথমে পলি হাউস ও হার্ডেনিং জোনে প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর কৃষকদের কাছে সরবরাহ করা হয়। ফলে মাঠে চারার টিকে থাকার হারও বেশি হয়।
এনামুল ইসলাম বলেন, ভারত থেকে আমদানি করা একটি জারবেরা চারার দাম যেখানে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, সেখানে একই মানের দেশীয় টিস্যু কালচার চারা মাত্র ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে।
মোস্তফাপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক আশুতোষ কুমার বিশ্বাস জানান, টিস্যু কালচার প্রযুক্তির পাশাপাশি কেন্দ্রটিতে ক্যাকটাস গবেষণাতেও সাফল্য এসেছে। বর্তমানে সেখানে ২১০ প্রজাতির ক্যাকটাস সংরক্ষিত রয়েছে, যার মধ্যে ৬০টির বেশি প্রজাতি বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির উপযোগী।
তিনি বলেন, গত অর্থবছরে ক্যাকটাস বিক্রি করে কেন্দ্রটির আয় হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। একই সময়ে টিস্যু কালচার ল্যাবে উৎপাদিত চারা বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৪ লাখ ৮০ হাজার ৯০০ টাকা।
প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, উন্নতমানের রোগমুক্ত চারা কৃষকের কাছে সহজলভ্য করা এবং গবেষণার ফল দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়াই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি দেশীয় নার্সারি খাত শক্তিশালী হচ্ছে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, আধুনিক কৃষিতে মানসম্মত ও রোগমুক্ত চারার বিকল্প নেই। টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সুস্থ চারা কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, যা উৎপাদনশীলতা ও ফসলের গুণগত মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
তিনি আরও বলেন, কৃষিকে রপ্তানিমুখী করার সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও টিস্যু কালচার প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।