
টানা অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধিতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। বরিশাল অঞ্চলের পাঁচ জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ২৯ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন ফসল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে আর্থিক ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভোলা জেলা। জেলার কৃষি বিভাগ প্রাথমিকভাবে প্রায় ৯ কোটি টাকার ফসলহানির হিসাব দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে, ৯ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে বরিশাল অঞ্চলের ৪১ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমন ধানের বীজতলা। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের আবাদও পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
জেলাভিত্তিক হিসাবে, পিরোজপুরে প্রায় ২৩ হাজার ৯২৫ মেট্রিক টন আমন বীজতলা এবং ১ হাজার ৬৮০ মেট্রিক টন গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি নষ্ট হয়েছে। ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৬৪৩ মেট্রিক টন, পটুয়াখালীতে ২৪৪ মেট্রিক টন, বরগুনায় ৪৯৮ মেট্রিক টন এবং ভোলায় ১ হাজার ৯৬০ মেট্রিক টন ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ভোলায় প্রায় ৯ কোটি টাকা, পিরোজপুরে ৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ঝালকাঠিতে ২ কোটি ৪৫ লাখ ৪ হাজার টাকা, পটুয়াখালীতে ১ কোটি ৩ লাখ ১৫ হাজার ৯০০ টাকা এবং বরগুনায় ৮৪ লাখ ১০ হাজার টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ফসল আক্রান্ত হয়েছে বরগুনা জেলায়। সেখানে ৬ হাজার ৭০৯ হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবে গেছে। আর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পিরোজপুরে—প্রায় ১ হাজার ৪৬৫ হেক্টর। এছাড়া সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে ২৫৭ হেক্টর জমির ফসল।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা বলছেন, চলতি মৌসুমে এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার খাসেরহাট এলাকার কৃষক নারায়ণ চন্দ্র বলেন, “অনেক কষ্ট করে আমন বীজতলা তৈরি করেছিলাম। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সব পানির নিচে চলে গেছে। এখন নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে। কীভাবে সেই খরচ জোগাড় করব, সেটাই বুঝতে পারছি না।”
চরফ্যাশনের এওয়াজপুরের কৃষক জাহাঙ্গীর হাওলাদার বলেন, “এক একর জমিতে মরিচ চাষ করেছিলাম। নদীর পানি বেড়ে পুরো ক্ষেত ডুবে গেছে। কয়েক মাসের পরিশ্রম এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল। এখন ঋণ কীভাবে শোধ করব, সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তা।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বরিশাল অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি পিরোজপুরে। সেখানে ২৫ হাজার ৮০০ জন কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এছাড়া পটুয়াখালীতে ৮ হাজার ৭৭০ জন, ভোলায় ৩ হাজার ৮০০ জন, ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৭১৫ জন এবং বরগুনায় ১ হাজার ১২৫ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
রফিকুল ইসলাম বলেন, “এখনও বরিশাল অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। নদ-নদীর পানি অনেক এলাকায় বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং নতুন নতুন ফসলি জমি প্লাবিত হচ্ছে। ফলে ক্ষতির পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।”
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা চূড়ান্ত করে বিনামূল্যে আমনের বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ বিতরণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় চলতি মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলের কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।